পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ৮ মে, ২০২০

সম্পাদকীয় কথা


লকডাউনের মধ্যে আজকের দিনটাও পড়ল । আমরা নিজেদের গৃহবন্দি রেখে আসর সাজালাম । অমলের মতো বাইরের কল্পনাটুকুতেই আনন্দ । পঞ্চক আবারো গান গেয়ে উঠবে পঞ্চমে । বিশ্বাস করছি নীলকন্ঠপাখিরা যখন গাছে গাছে ঘুরছে অসুখ তখন সারবে । রাজা বেরিয়ে আসবে জাল ছিঁড়ে । এই কঠিন সময়ের দীক্ষাতে বলাই এর গাছমন আমরা ছিঁড়ব না । এই অসময়ে প্রকাশিত হল আমার বাংলা পত্রিকার ২৫ শে বৈশাখ ১৪২৭ সংখ্যা ।


নীচের লিংকে গিয়ে সহজে পাবেন এই সংখ্যা
২৫ শে বৈশাখ ১৪২৭

ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথ এবং কোভিড ১৯ ও তার অনুগামী সংকটের মোকাবিলায় তাঁর প্রাসঙ্গিকতা .............হরিসাধন চন্দ্র



    উপনিষদের প্রত্যয় ছোটবেলা থেকেই তাঁর 'বাবামশায়'-এর সচেতন শিক্ষা ও সাহচর্য এবং ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অন্তরজগতে প্রবেশ করে তারপর নিজের নানা অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাওয়া উপলব্ধির ফলে এমন এক বৃহত্-মহত্ স্থান অধিকার করে নিয়েছিল যে, সেটাই তাঁর চিন্তন ও যাপনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল । তাঁর অগণিত রচনার মধ্যে তার প্রতিফলন  পাওয়া যায়। এখন দেখা যাক বিশ্বব্যাপী কোভিড ১৯ ও তার অনুগামী সংকটগুলির মোকাবিলায় তা কতটা প্রাসঙ্গিক । 
     উপনিষদের মূল বার্তা হল, সবকিছু মিলিয়ে বিরাজ করছেন এক সচেতন অখণ্ডতা অর্থাত্ ব্রহ্ম। এর মধ্যে ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান --- 'সত্যম্' অর্থাত্ চিরন্তন ও অবিসংবাদিত, 'শিবম্' অর্থাত্ মঙ্গল  এবং 'সুন্দরম্' অর্থাত্ আনন্দদায়ক আর তাই প্রেমজাগরূক । ব্রহ্ম নিজেকে প্রকৃতি রূপে প্রকাশ করলে এই বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকট হয় ।  তখন তাকেই বলা হয় সগুণ ব্রহ্ম । এই বিশ্বব্যাপী প্রকাশ তাঁর ঐশ্বর্য, আর ঐশ্বর্য আছে বলেই তিনি 'ঈশ্বর'। আর প্রকাশিত রূপের অন্তরালে যে অরূপ সত্তা  থাকে তা হল নির্গুণ ব্রহ্ম । স্বরূপত উভয়েই এক । ব্রহ্মের এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কোনোভাবে ব্যাঘাত ঘটলেও আবার নিজের স্বরূপে ফিরে আসাটাই এর চরম পরিণতি। এই প্রতীতি ধ্বনিত হয়েছে তাঁর সিংহভাগ লেখাতেই, আর যেখানে তা হয়নি সেখানেও কিন্তু এই প্রতীতির বিরুদ্ধ কোনো ভাবের প্রকাশ ঘটেনি । তাঁর ওই ঔপনিষদিক দর্শনের বাহক কয়েকটি গানের অংশ উদ্ধৃত করা গেল : 
১) 'সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে ।'
 ২)তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি যাই 
কোথাও দুঃখ কোথাও মৃত্যু  কোথা বিচ্ছেদ  নাই
- - - - -------------- ----- ------  ------- ------- ---- ---- ----- --     ------
হে পূর্ণ তব চরণের কাছে 
 যাহা কিছু সব আছে আছে আছে 
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই 
নিশিদিন কাঁদি তাই।
৩)  বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিরাজ      
 সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও ।
৪)আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া 
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া । 
৫)রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি । 
                                      ( গীতবিতান )
 এই সচেতন অখণ্ডতাকে নিজের অন্তরে প্রত্যক্ষভাবে  উপলব্ধি করতে পারলে তখন সারা বিশ্বের সমস্ত কিছু  মিলেই তো 'আমি' ----এই উপলব্ধি হয়।অর্থাত্ তখন রক্ত-মাংসের দেহটার মধ্যে সীমাবদ্ধ 'আমি'টা বাড়তে বাড়তে অসীম হয়ে ওঠে ।এটাই রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় বড়ো 'আমি'। তখন আর ঈশ্বর অর্থাত্ উপাস্য আর ভক্ত অর্থাত্ উপাসকের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না, অর্থাত্ উভয়ের আর দুটি পৃথক সত্তা থাকে না। তখন দ্বৈত পর্ব শেষ হয়ে অদ্বৈত সত্তায় পৌঁছে যায় উপাসক । তখন উপাসকের উপলব্ধি  : '  বিভিন্ন উপনিষদের নির্যাসের সুসংহত রূপ বেদান্ত দর্শনে এই অদ্বৈতবাদেরই সুবিস্তৃত ও যুক্তিনিষ্ঠ রূপটি পাওয়া যায় । কিন্তু এই বড়ো আমির পর্যায়ে পৌঁছানো তো সহজ নয়। অজ্ঞানতার বশে অহং বোধ ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তার বেড়া দিয়ে আমাদের আটকে রেখে দেয়, বড়ো হয়ে উঠতে দেয় না । সেই  বেড়া ভেঙে বিশ্বসত্তার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আর্তি নিয়েই ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করে, প্রার্থনা জানায়, যাতে তিনি উপাসককে নিজের মধ্যে গ্রহণ করে নেন। এতেই চলে ভক্ত ও ভগবানের লীলা। এতে কত মান-অভিমান, আশা-হতাশা, আনন্দ-বিষাদ । এই লীলা আস্বাদনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই ব্রহ্ম একমদ্বিতীয়ম্ হওয়া সত্ত্বেও বহু ও বিচিত্র রূপে প্রকাশ করেন। কিন্তু সেই সব রূপ মিলেই তাঁর প্রকট সত্তা । এই অদ্বৈতবাদের উপলব্ধি পুরোপুরিভাবে যাঁর মনে জাগবে, তিনি কাউকে ভয় পাবেন না, কাউকে শত্রুজ্ঞানে আঘাত করবেন না। কারণ সবকিছু তো তাঁরই রূপভেদ মাত্র । তিনি কাউকে শত্রু মনে করবেন না। যদি তাঁর সান্নিধ্যে বা গোচরে এমন কোনো ব্যক্তি থাকে, যার উচ্চারণ-আচরণ  অসঙ্গত  , তাহলে তার শোধনের জন্য যেটুকু আঘাত দরকার, সেটুকুই কেবলমাত্র তিনি করবেন,কিন্তু অন্তরে থাকবে ভালবাসা। 'রক্তকরবী'র রাজা অগণিত মানুষকে শোষণ করে শক্তির অধিকারী হয়েছিল বলে রঞ্জনের নেপথ্য অনুপ্রেরণায় নন্দিনী রাজার প্রতিস্পর্ধী চরিত্র হয়ে রাজ্যে বিপ্লবের ঝড় এনে তোলপাড় ঘটিয়ে দিয়েছে, কিন্তু পরিণতিতে রাজাকেও  তাতে সামিল করেছে । এই দৃষ্টান্ত ভারতের বাইরে থাকলেও তা বিরল। আর উপনিষদের যে ভয়হীনতার বলিষ্ঠ প্রেরণা আছে 'অভী' বাণীর মধ্যে, তারই জয়গান করেছেন রবীন্দ্রনাথ নানা স্থলে । ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা  : 'ভয় হতে তবে অভয় মাঝে নূতন জনম দাও হে।' আবার এক জায়গায়  :
          'এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়, 
          দূর করে দাও তুমি সরব তুচ্ছ ভয়--
          লোকভয়,রাজভয়,মাত্রায় আর।'
                                                          (নৈবেদ্য)
এই সমস্ত ঔপনিষদিক প্রতীতির বাণীরূপ তাঁর 'শান্তিনিকেতন' গ্রন্থে প্রতিটি নিবন্ধেই সুলভ।  
      এবার আসা যাক সারা বিশ্বকে উত্কণ্ঠিত করে তোলা নোভেল করোনা আর তার আনুষঙ্গিক সংকটাবলীর মোকাবিলায় ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতার মূল্যায়নে ।  
     আজ  বিশ্বের সকলকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস, সমন্বয় এবং যুক্তিনিষ্ঠ ও বাস্তব প্রয়োগের উপযোগী কর্মসূচি নিয়ে এগোতে হবে ।কিন্তু কোথায় তা? আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তো দূরের কথা ,আমাদের জাতীয় পটভূমিতেও তার অভাব মাঝে মধ্যেই বড়ো নগ্ন হয়ে ফুটে উঠছে ,যা সমস্যার সমাধানের সামনে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিজের ত্রুটি স্বীকার না করে তাকে ঢাকা দেওয়ার অপচেষ্টা, নিজের জয়গান নিজেই প্রচার করা, প্রতিপক্ষের কোনো ভালো কিছুকে স্বীকৃতি না দিয়ে বরং তার ছিদ্রান্বেষণ এসবের ফলে ঐক্যবোধ, বিশ্বাস, সমন্বয়, বাস্তপোযোগী কর্মসূচি গ্রহণ-- সবই ব্যাহত হচ্ছে । বিশ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে পরস্পরের প্রতি ।অথচ এই মহাসংকটে সেটা অপরিহার্য । তাই 'মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ'(সভ্যতার সংকট) --- এই  রবীন্দ্রভাষ প্রতি মুহূর্তে মননে জাগরূক রাখতে পারার উপযোগিতা এখন বিরাট । আর যতই প্রচার করা হোক ভয় না পাওয়ার প্রেরণা জোগাতে, ভয় তো জাগছেই। এই ভয় নিরসনে তো 'অভী'র মহাভাষ্যকার রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে বড়ো আশ্রয় । তাই আজ রবীন্দ্রনাথের জন্মপক্ষের সূচনালগ্নে আশা রাখছি, ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় শুরু হতে পারে সমাধান প্রয়াসের  নতুন  অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথেরই সমকালীন ও প্রায় সমবয়সী বিবেকানন্দও এই প্রত্যয়ে দৃঢ় ছিলেন যে, অদ্বৈতবাদই পারে বিশ্বমৈত্রীর প্রতিষ্ঠা করতে । আর এটাও বলেছিলেন, 'এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ ' (বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা )। তাই ভারতই আজ পথ দেখানো শুরু করুক না! আর এক পা এগিয়ে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে, যে দেশের জাতীয় সংগীত( National Song) ও জাতীয় স্তোত্র (National Anthem ) বঙ্গসন্তানের রচনা, সে দেশের এই মহাভিযানে মহামতি গোখলের এই বাণীর বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রেও সম্ভব  :  'What Bengal thinks today.......'
         তবে দুঃখের বিষয়,  কী ব্যক্তি কী গোষ্ঠী, বেশির ভাগের মধ্যেই দেখা যায় নিজের কোনো মতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ,সোজা কথায় বিপক্ষকে হারিয়ে জেতার জন্য কোনো বহুজনস্বীকৃত মানুষের সামগ্রিক জীবনদর্শন বা যাপনধারার একটা অংশ নিজের প্রয়োজন মতো তথাকথিত যুক্তির ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে  কেটে নিয়ে সেই রক্তাক্ত খণ্ডটিকে আলোচনার থালায় সবার সামনে পরিবেশন করে শ্লাঘা অনুভব করার প্রবণতা । রবীন্দ্রনাথও সেই নির্মমতা থেকে রেহাই পাননি । রবীন্দ্রবীক্ষণের এই ঔপনিষদিক দিকটিকে কার্যত অস্বীকার করে বা অপব্যাখ্যা করে মানবতাবাদী হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা অনেকেই করে । একজন বড়ো মাপের মানবতাবাদী তো তিনি অবশ্যই ছিলেন,  কিন্তু আজীবন তাঁর মানবতাবোধের জয়গান ছিল ঔপনিষদিক বোধির স্বরগ্রামে বাঁধা । আর এই ঔপনিষদিক অধ্যাত্মবাদকে ভাববাদী ধারণা বলে অনেকেই উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।কিন্তু মনে রাখা উচিত, 'বিজ্ঞান' শব্দটি উপনিষদেই উচ্চারিত হয়েছে প্রথম । আর সেক্ষেত্রে এটি কোনো আচারপ্রধান ধর্মের অঙ্গ নয়, বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার উত্সার। তার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের স্বরূপত কোনো বিরোধ নেই ।আর রবীন্দ্রনাথের ঔপনিষদিক সত্তাও বিজ্ঞানচর্চার বিরোধী তো ছিলেনই না, বরং অত্যুত্সাহী ছিলেন এব্যাপারে, এমনকি বিজ্ঞানবিষয়ক বইও লিখেছেন একাধিক । নিজের পুত্রের একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার ব্যবস্থাও করেছেন, বিশ্বভারতীতে বিজ্ঞান শিক্ষার সুপরিকল্পিত ভিত্তি  স্থাপন করেছেন । তাই তাঁর  ঔপনিষদিক সত্যকে অস্বীকার বা অবহেলা করার অর্থ শুধু রবীন্দ্রনাথের অবমাননাই নয়,  আমাদের এই মহাসংকটের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের জন্য মহামূল্যবান একটি অস্ত্রের শোচনীয় অবহেলা ।  তাই এই রবীন্দ্রপক্ষে বিশ্বের সামনে অদ্বৈতবাদে অভিস্নাত রবীন্দ্রদর্শনকে তুলে ধরার দায়িত্ব নিক ভারতবর্ষ বিশেষত বঙ্গভূমি

" ঠাকুর যেমন " ............. স্বপন বিশ্বাস


          আমার চোখে রবীন্দ্রনাথ " -- বিষয়টি মূলত স্মৃতি নির্ভর  , আর স্মৃতি হ'ল স্বভাব দূর্বল। তাই একটু সন্ধান করে করে তাদের সংগ্রহ করে সময় সারনী অনুসারে সাজিয়ে নিতে হবে।
       বাল্যে লক্ষ্মী, গণেশ, হনুমান সহ অনেক ঠাকুরের সাথে প্রায় একাসনে বিরাজমান ছিলেন রবীন্দ্রনাথ -- প্রসাদ ও কাঁসর-ঘন্টা ছাড়াই ফুল মালা চন্দন চর্চিত "ঠাকুরের" ছবিতে ধূপ দেখানো হোতো নিয়ম মেনে। আর বিশেষ পূজার দিন ২৫শে বৈশাখ -- সেদিন স্কুল-কলেজ থেকে পাড়ার মঞ্চ মুখরিত হোতো গীত-বাদ্যে-আচারে ; সেদিন হৃদয় থেকে উৎসারিত হোতো রবীন্দ্র-মন্ত্র -- "২৫শে বৈশাখ  হে নূতন .... "; আর রবিঠাকুরের পূজায় আমার সবথেকে ভালোলাগার দিকটি ছিল উপবাসহীনতা।

          আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন পাঠ্যের বাধকতা -- ভালোলাগার বাঁধন তখনও পর্যন্ত শেকড় ছড়ায়নি ; তুলনামূলকভাবে শরৎচন্দ্র, বিশেষ করে ' শ্রীকান্ত ' গোগ্রাসে গিলছি। ১৬-১৭ বছর বয়স অবধি গদ্য সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, ডায়েল সাহেব, শিবরাম, সত্যজিৎ, সুনীল ইত্যাদির কাছে রবীন্দ্রনাথ গোহারা হারছেন, এমনকি সহজলভ্য স্বপন কুমারও কম যান না। যদিও অনেক পরে জেনেছিলাম যে ঋষি রবীন্দ্রনাথ উচ্চ-কোটির কবি সাহিত্যিকদের জন্য লেখেন এবং আরও পরে অনুভব করলাম উপনিষদ না পড়ে রবীন্দ্র পাঠেও সমান পূণ্য।

          যাইহোক, পরিবর্তনশীল জগতে সময়ের সাথে সাথে আমরা নিজেদের মতো করে পাল্টে নি শাশ্বত রবীন্দ্রনাথকে। এদিকে ১৮ -- ১৯ বছর বয়সে শুনলাম রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি এবং সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার এক জমিদার পুত্রের সাধের বিলাস হ'ল তাঁর সাহিত্য রচনা। কিন্তু তবুও  পরিক্ষার খাতা থেকে জলসা সর্বত্রই 'ঠাকুরের' দেবতুল্য  দৃপ্ত আনাগোনা তখনও অবিরাম। এমনকি সামঞ্জস্যপূর্ণ কোটেশন মনে না পড়লে সদ্য শোনা  কোনও গানের দু এক লাইন ইনর্ভাটেড কমার মধ্যে ঢুকিয়ে রবীন্দ্রনাথের বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও সেই সময়ের উত্তরপত্রগুলিতে পাওয়া যেত, যেমন --
" তাইতো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন --
      'যা চেয়েছি আমি তা পাই না
        যা পেয়েছি কেন তা চাই না ....'  "
পরে সেই উত্তরপত্রের মালিকের সাথে পূর্ব করপোরাল পানিশমেন্ট যুগে বাংলা ক্লাসে কী ঘটতো তা বুঝতে পারার জন্য কোনো পুরস্কার নেই।

       তা এই আপেক্ষিকবাদের পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ বদলে যেতে থাকেন সময় থেকে সময়ে, বয়সের ধাপে ধাপে । আমি যে আপোষহীন ছাত্রনেতাকে নিষিদ্ধ কর্মে রত হতে দেখেছি , অভিসারের লক্ষ্যে  তাকেই হারমোনিয়ামে প্রাণপণে তুলতে দেখেছি -- " ন্যায় অন্যায় জানিনে জানিনে জানিনে ... " । তখনই বুঝেছি রবি কবির দ্বার সবার জন্যই অবারিত -- আশ্রয় প্রশ্রয়ের বাছবিচার সেখানে নেই ; তাঁকেই সবার দরকার -- তাই গোপনে বা সোচ্চারে অবাধ প্রবেশ তাঁর দরবারে।

            উৎকৃষ্ট সাহিত্য হোক বা ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী -- গীতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, তাই কালজয়ী। ঠিক তেমনিই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে রবীন্দ্র রচনা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সঙ্গীত, কাব্য, সাহিত্য, কলার পুরুষ সরস্বতী হলেন রবীন্দ্রনাথ। বিষয় ভাবনার ব্যপ্তি ও বৈচিত্র্যে তিনি অসজ্ঞাত  -- যেকোন ভাবনার রঙের যেকোন শেড্ তাঁর কাজের কোলাজে ঠিক খুজে পাওয়া যাবে  -- যার যেমন প্রয়োজন খুজে নিতে পারে তাঁর সম্ভার থেকে।

          '  জল পড়ে পাতা নড়ে ' থেকে শুরু করে সীমানা ছাড়িয়ে অসীমে তাঁর বিচরণ -- যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানের স্থান কাল পাত্র অনুযায়ী ও নিজের চিন্তন অনুসারে তিনি বিমোচিত হন  , আবার সময়ের পথ ধরে এগিয়ে গেলে ফেলে আসা সময়-বিন্দুর রঙ রস গন্ধ অন্য রূপে ধরা দেয়। অনেকেই আবার সেখান থেকেই আগামীর সন্ধান পায়।

           ভাবনার ব্যবহারিক প্রয়োগে ও যাপনে তিনি ছড়িয়ে আছেন, জড়িয়ে আছেন  --  সমঝদার, ভক্ত, রসিক, সমালোচক ও শিল্প-কীটেরা ঠিক তাঁকে খুজেঁ পেতে নিয়ে মধু খায়, মাতাল হয়, গান গায়, রসদ জমায় ও সমৃদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথ হলেন বহতি গঙ্গা  --- ডুবকি লাগাও আর সত্য-শিব-সুন্দর পাও। 

আমার ছেলেবেলা আর আমার রবীন্দ্রনাথ ......... প্রদ্যোত আশ



জানি আমি কোন কেউ কেটা নই তবে কি নিছকই অপাংতেয় -  তা হয়ত নয় - তাহলে এই যে তুমি পড়ছ -  এটা পড়তে না । সে যাই হোক আমারো ছেলেবেলা জুড়ে আছে অনেক কিছুই তাঁর মধ্যে আছে রবীন্দ্রনাথ । কবে কোন বয়স থেকে রবীন্দ্রনাথ মনের ভেতর রয়েছে বলতে পারবো না -  এই না পারাটার পেছনে একমাত্র দায়ি আমার বাবা মা - বাবা একটু বেশিই । তখন বাবা ঘরের থাকার সময়টা আকাশবাণী খুলে রাখনতেন -  কলকাতা ক প্রচার তরঙ্গ আর সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন তাঁর একমাত্র আড্ডার জায়গা রবিতীর্থ ( তুলিন রুরাল লাইব্রেরী ) । আমার গল্পের বই পড়াটা শুরু ওই রিডিং পড়া শুরু থেকেই । আর কখন যে শিব ঠাকুর কালি ঠাকুর দের মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও একজন ঠাকুর পরিবারের সদস্য হয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন -  আমি জানি না -  আমি জানতাম সীতাকে গণ্ডীর মধ্যে রেখেছিলেন লক্ষণ আর রবীন্দ্র নাথ কে ঘরের চাকর আমার কাছে তখন দুটো গণ্ডী ই সমার্থক তাই মা ঘর থেকে বেরোতে বারণ করলে কঠা ঘরের জানালার রড ধরে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম বনডি পাহাড়ের মাথার দিকে -  মা বলত বাঘ আছে - আমি ভাবতাম অমল ও দইওয়ালার কথা । মনে আছে ক্লাস টু তে অভিনয় করার কথাছিল রিহার্সাল করেছি অমলের ভূমিকাই শেষ পর্যন্ত দইওয়ালার শরীর খারাপ হওয়াতে নাটক টা করা হয়নি -  মজার ব্যাপার হল আমার মা তাতে খুশি হয়েছিলেন -  আসলে আমার বাবা মাকে ডাকঘরের গল্পটা বলেছিলেন -  বলেছিলেন শেষে অমল মারা যাবে -  কোলের ছেলেকে ওই চরিত্রে মা মানতে পারেনি ।
আমার বাবা একা একভাই আর দাদা অনেকটা ছোটথেকেই মামা ঘরে -  তবু বাখুল ঘরে তোতো ভাই বোন দের অভাব ছিলনা , এই নিয়ে একটা হই হই ব্যাপার ছিল । আমি চালচুয়ানি - কুমিরডাঙ্গা যেমন খেলেছি রামায়ণের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেছি সিন্দুয়াঁ ডালের ধনুক নিয়ে -  ব্যাট বল খেলেছি অনেক সময় বাঁশের ডাঙ্গের ব্যাট আমড়ার বল আর বালতিকে উইকেট করেই । আর এই এত কিছুর সঙ্গে ছিল আমার উদ্যোগে ঘরে ২৩ শে জানুয়ারী আর ২৫ শে বৈশাখের পূজো -  ভোগের ব্যবস্থা মা করতেন বাকিটা আমরা । খাতার পাটাতে বিয়ে ঘরের কার্ডের রঙিন কাগজ চিটিয়ে তাতে তরুণ মামার দোকান ( সোনামুখী) থেকে আনা ২৫ পয়সার রবীন্দ্রনাথের ছবি চিটিয়ে মালা পরিয়ে ২৫শে বৈশাখ ।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রত্নদীপ ভদ্র


তোমার প্রিয় কবি 'রবীন্দ্রনাথ', এই রচনা মুখস্থ করতে বসে চতুর্থ শ্রেণীতে প্রথম পরিচয়। 'কবি' তে 'ই'কার, 'রবি' যে 'ই'কার, যেই হলো 'রবীন্দ্রনাথ' ওমনি দুম করে 'ঈ'?
বাবাকে বললাম 'ভুল লিখেছেন', বাবা বোঝালেন কি সব সন্ধি না ছাই! তখনকার মতো সন্ধিস্থাপন হলেও মনঃপূত হলো না।
বাবা ছবি দেখিয়ে চেনালেন। ' মা গো! কি বিচ্ছিরি। একগাল দাড়ি, ঠিক 'মহাভারতের' ভীষ্মের মতো।' নিজের মতো করে বুঝলাম অনেক বুড়োবয়সে কবি হয়েছেন বোধহয়।
সেই থেকেই এই লোকটিকে আমি ঠিক পছন্দ করি না।

 স্কুলের উঁচু ক্লাসে আবার অন্য বিপদ!  আমি বুঝলাম একরাজা আর ভিখারির গল্প নিয়ে লেখা কবিতা, বড্ড সাদামাটা, স্যার বলেন না, খুব জটিল, পরোমব্রহ্ম কে নিজেকে উৎসর্গ না কি সব।পড়ে বুঝি এক, স্যার বোঝান আরেক। আচ্ছা মুশকিল! পড়তে তো ভালোই লাগে কিন্তু কি যেন বোঝা বাকি থেকে যায়।
প্রতি বছর স্কুলে আমি 25শে বৈশাখ কবিতা আবৃত্তি করে প্রশংসা পাই। কবিতা মুখস্থ করে বলতে হবে তাই বার বার পড়ি, ' বীরপুরুষ' , 'আফ্রিকা', ভালো লাগে পড়তে কিন্তু ঠিক ধরতে পারিনা। ধুর ছাই। বাদ থাক, আমার আরও ঢের কাজ থাকে।

কলেজে বাবা আমি ইংরেজি অনার্স! এলিট ক্লাস। জন ডান, মিল্টন ইংরাজীর তুবড়ি।প্রিয় বন্ধুরা অনেকেই অন্য ডিপার্টমেন্ট।ওরা কি সব বাংলা না কি যেন পড়ে।

 ক্যান্টিনের আড্ডাতে তুমুল ঝড় তনুশ্রী, মৌসুমী, সব্যসাচী দের সাথে, ওই রবীন্দ্রনাথ নাকি ' কালজয়ী', যতসব। আরে বাবা 'গীতাঞ্জলি'টা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছিল বলেই না পেলো। নাহলে ধরে কাছে থাকতো শেক্সপিয়ার, কিটস, শেলীর? যতসব আদিখ্যেতা!

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এলো প্রেম। চিঠিতে ছত্রে ছত্রে প্রেমিকা কোট করে সেই রবীন্দ্রনাথ। বড্ড ঝামেলা। জবাব দিয়ে ঝাড়লাম মিল্টন, ব্যস, আর কি , ফুস! রাগ টা গিয়ে পড়লো ওই রবীন্দ্রনাথের ওপর। আমারই দোষ কেও রবীন্দ্রনাথ পড়া মেয়ের সাথে প্রেম করে?

কলেজের পর অখণ্ড অবসর, বেকার তো। ওই সারাদিন বাড়ির লোককে দেখিয়ে পড়াশোনা আর বিভিন্ন লেখকের বই। বেছে পড়িনা, যা পাই। বাড়িতে অনেক বই, না না আমার নয়, মা বাবা দুজনেই যে বাংলার শিক্ষক। শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, দ্বিজেন্দ্রলাল, মাইকেল, শংকর, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সত্যজিৎ বাদ যায় না কিছুই। শেষে তাক ঝেড়ে, বাধ্য হয়ে বারকরলাম,  'গোরা', ' বউ ঠাকুরানীর হাট' 'রাজর্ষি', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', ' ছুটি', 'ক্ষুধিত পাষাণ', আরো কত। দুচোখে বিস্ময় একজনের পক্ষে এক জীবনে পড়ে শেষ করা যায় না তুমি এতই বিস্তৃত! বুঝলাম কিছুই বুঝিনি এতকাল।

"মানুষের মধ্যে দ্বিজত্ব আছে;
মানুষ একবার জন্মায় গর্ভের মধ্যে,
আবার জন্মায় মুক্ত পৃথিবীতে।
মানুষের এক জন্ম আপনাকে নিয়ে,..." 

সিংহাসন ...........কৌশিকী গোস্বামী



অদম্য চাহিদাদের ঘিরে সমসাময়িক পরিস্থিতি নিজের আবেগ তার প্রতিটা পদক্ষেপ, ভাবনার পরিধি সবটা জুড়ে যখন বিতশ্রদ্ধ হয়ে যাই নিজের ওপর বা সমাজের ওপর বা নিজের কাছের মানুষদের ওপর তখন ওই সাদা চুল সাদা দাড়ির মানুষটা প্রলেপের কাজ করে সারা দেহ মন জুড়ে, প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কে সজীব করে দেয়। বাঁচিয়ে রাখার রসদ যোগায়।প্রতিটা ক্ষণে তাঁর উপস্থিতির এক উজ্জ্বল মহিমা আরও দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলার অঙ্গীকার বদ্ধ করে।
তাঁর সৃষ্টির ভোগাস্বাদনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি আছে। যেমনটা "শেষের কবিতা" পড়ে প্রেম খুঁজে পাই, তেমনি সামাজিকতার চালচিত্র হিসেবে "রক্তকরবী" এক অনন্য উদাহরণ। তেমনি ছোটবেলা টা মনে করিয়ে দেয় "পোস্টমাস্টার", "অমল ও দইওয়ালা"। ঠিক তেমনি "বলাই" শেখায় প্রকৃতি প্রেম। সম্পর্কের ওঠা নামা যে জীবনের একটা অংশ তা তাঁর "চোখের বালি" ও "নৌকাডুবি" পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায়। সহজ পাঠ হতে যে যাত্রার সূত্রপাত তার শেষ পংক্তি টা লেখা থাকে 'শেষের কবিতায়'
"হে বন্ধু বিদায়।"
ওঁনার প্রতিটা লেখার মাধ্যমে তিনি সময়ের পরিপ্রেক্ষিত রচনা করে গেছেন। তাই তো উনি আমার ঠাকুর আমাদের প্রাণের ঠাকুর।।

ভাবনার আলোকে রবীন্দ্রনাথ ..............কনিষ্ক দেওঘরিয়া


একদিন আলোর পাশে এসে দাঁড়ালাম ,
বারবার আলোর পাশে দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে ।
অন্ধকারের মধ্যে দুঃখ গুলো দেখা যায় না বলে মানুষ অন্ধকারকে অবহেলা করে । আসলে মানুষ দুঃখ পেতে চায় । কবিতা গান গল্প এসবের মধ্যে যে প্রাণ লুকিয়ে আছে তা বুঝতে গ্যালে আলোর পাশে দাঁড়ানোর জায়গাটা শক্ত করে নেওয়া ভীষণ জরুরী । আমরা  মাঝেমাঝেই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হই - আবার রবীন্দ্রনাথকে পড়ে পারও পেয়ে যাই । দুঃখ যন্ত্রণা প্রেম ভালোবাসা আনন্দ - এই আবেগের কোনো বয়স নেই রবীন্দ্রনাথ পড়েই তা স্পষ্ট হয়ে গেল । যতটুকু রবীন্দ্রনাথ বুঝেছি তার সারমর্ম এই যে , নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে ভেঙে - গড়ে নতুন করে-পুরোনো ভাবে সৃষ্টি ও ধ্বংস করা সম্ভব । আর যে আলোটির সামনে জীবনকে প্রতিনিয়ত মোচড় খেতে দেখি সেই আলোটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।।

যা কিছু রাবীন্দ্রিক.... আরাধনা মাহাতো



সশরীরে না থেকেও একসাথে হাজার হাজার সম্পর্কের সম্পৃক্তকরণ একজনের পক্ষেই মর্যাদার সাথে পালন করা সম্ভব , তিনি আর কেউ নন - রবীন্দ্রনাথ ।
না তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নন , তিনি হলেন প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ।

" ভোরের তিমির বিদারী আকাশে ওঠে যে রবি
সে তো মুক্তির রক্তিম আলো ছড়ানো তুমি , কবি ..... "

পারিজাত বিকাশ রায়ের এই লেখাই যেন বারবার বলে দেয়   রবি ছাড়া দিনের শুরু সম্ভব নয় । রবীন্দ্রনাথ মানেই সূর্যোদয় থেকে গোধূলির শেষ সূর্য্য আর সূর্যাস্ত থেকে নতুন ভোরের প্রথম রক্তিম সূর্য্য । রবীন্দ্রনাথ মানেই আট থেকে আশির সেই প্রাণের রবি যিনি  জড়িয়ে আছেন মনের মণিকোঠায় ।

' রবীন্দ্রনাথ ' শব্দটার উচ্চারণ যখন ঠিকমতো স্পষ্ট নয় তখন থেকেই চোখের কাছে চেনা মুখ হয়ে যায় ' সহজ পাঠ ' এর প্রচ্ছদ ।
জ্বাল দেওয়া চুলোর ধোঁয়ায় মিশে থাকা আর দোতলার নীচে পাখার হওয়ায় বসা ছেলে দুটোর হাতেই থাকে সহজ পাঠের একই চেনা বই ।

একটা সময় যৌবন হানা দেয় । নদী যেমন ভরা যৌবনে উত্তাল , মানুষও তেমনি যৌবনে টগবগিয়ে ফুটে অহর্নিশ । তখন জীবনে আসে এক অন্য রবীন্দ্রনাথ । পরিচয় হয় " সোনার তরী " , " চিত্রা " ।
দিনরাত কানে বাজে " ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে নামটি লিখো "
রবীন্দ্রনাথের যেন তখনও যৌবন কাটেনি । রবীন্দ্রনাথ প্রেমিক হয়ে মনে বসেছেন অনেকের ।

আস্তে আস্তে যৌবনের ঘোর কাটে , সময় আর পরিস্থিতির ঘোরটোপে তখন নাজেহাল মন । একটা স্থিরতা গা বেয়ে জাঁকিয়ে বসে নিজের মতো করেই । তখন শেষ দু পাতায় আটকে " শেষের কবিতা " । ততদিনে গানের ধরণও বদলে গেছে , তবে রবীন্দ্রনাথ বদলায়নি । শুধু রবীন্দ্রনাথের যৌবন কেটে গেছে । মাঝরাতেও গুনগুন করে ঠোঁট দুকলি গাইয়ে দেয় " তবে তুমি যাহা চাও , তাই যেন হই ...."

একটা সময় পর পরিণতি আসে জীবনে , রবীন্দ্রনাথ তখন হয়ে উঠেছেন কঠিন থেকে কঠিনতর । ঘরে তখন আর সহজ ভাষার রবীন্দ্রনাথ নেই । জোরকদম পড়া চলছে " ঘরে বাইরে " , " নৌকা ডুবি " , " গোরা " ।
" চোখের বালি " র প্রতি একটা টান অনভব হয়ে গেছে ততদিনে ।

এতদিন চশমা খুলে কোনোদিন ভাবার সুযোগ হয়নি " সহজ পাঠ " থেকে জীবন টা " নৌকা ডুবি " তে এসে ঠেকেছে । একটা পেপার  কভারের বই কখন একটা উপন্যাস হয়ে যায় জীবন বোঝার সুযোগ দেয়না , রবীন্দ্রনাথও দেননি ।

রবীন্দ্রনাথের প্রতিটা চরিত্রের খোঁজ শুরু হয় বাস্তবে । চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে , মনে হয় তারা বই এর মায়া কাটিয়ে উঠে এসেছে আমাদের চারপাশে । রবীন্দ্রনাথ গান লেখেননি , কবিতা লেখেননি , গল্প লিখেছেন শুধুই - আমাদের গল্প , প্রতিটা মানুষের আলাদা আলাদা গল্প ।

রবীন্দ্র সৃষ্টি যেমন একজন সদ্য প্রেমে ফেরা প্রেমিকের কাছে প্রেমের অলঙ্কার ঠিক তেমনি বিচ্ছেদের আগুনে অনর্গল পুড়তে থাকা বিরহিনীর কাছে বিরহের অন্ত্যমিল ।
তাঁর প্রতিটা লাইন যেন প্রতিটা মানুষের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হতেই এসেছে , একটা মানুষকেও ছাড়তে রাজি নয় তারা । গতপ্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক ছিলেন , বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক আর বলাই বাহুল্য ভবিষ্যতের সমস্ত প্রজন্মের কাছেই রবীন্দ্রনাথ আধুনিক থেকে যাবেন চিরকাল । যুগের পর যুগ যিনি আধুনিক , চির নতুন তিনিই কবি । তাঁর কাব্য সৃষ্টির পরই সার্থক ....

যে মানুষ রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে কোনোদিন চর্চা করেনি , যে মানুষ রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রতি বিশেষ আগ্রহী নয় , যে মানুষ প্রিয় কবির জায়গা থেকে বরাবর রবীন্দ্রনাথ কে বাদ দিয়ে এসছে তার ফোনেও বাজতে শুনেছি " যখন পড়বে না মোর পা এর চিহু ... "
একজন লেখকের জীবন বৃত্তান্ত জেনে , বেঁচে থাকার প্রানন্তকর লড়াই চিনে তাঁকে কুর্ণিশ জানানো আর সাধুবাদের মুকুট পরিয়ে দেওয়ার লোক কোনোকালেই কম পড়েনি ।
রবীন্দ্র সৃষ্টির কিচ্ছু লাগেনা , বহুবর্ণে খচিত কলমের নির্যাস  সমস্ত কিছু বইয়ে নিয়ে বেড়ায় । ঠিক এইখানেই রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেছেন অনেক অনেক আগে । এখানেই রবীন্দ্রনাথের স্বার্থকতা , রবীন্দ্র সৃষ্টির পরিপূর্ণতা ।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের মুক্ত হাওয়ার সঙ্গে পরিচয়ের হাতে খড়ি দিয়ে গেছেন । চার দেওয়াল যে সৃষ্টিসুখের কত বড়ো বিরোধী তা তিনি বহু বছর আগেই বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন । শাসনের আরেক নাম যে আদর তা চিরকাল অজানাই থেকে যেত রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। রবীন্দ্রনাথ মনের শান্তি , রবীন্দ্রনাথ প্রাণের আরাম ।

বেঁচে থাকতে কোনোদিন কোনো কবি তাঁর প্রাপ্য সম্মানের সম্পূর্ণটা পাননি , রবীন্দ্রনাথের প্রতিও তার ব্যতিক্রম হয়নি । তাঁর সৃষ্টির আকরের নির্যাস এক জীবনে আস্বাদন করা দুর্লভ এর চেয়েও বেশি কিছু । রবীন্দ্র কথার শেষ হয়না , শেষ করে দিতে হয় । তবুও দিনের শেষে লেগে থাকে .....
" তোমারে দিয়েছিনু সে তোমারই দান ,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায় ... "
আমরা রবীন্দ্রনাথকে আদতে কিছুই দিতে পারিনি , রবীন্দ্র সৃষ্টির মূল্যায়ন আমাদের সীমিত ক্ষমতায় কোনদিনই কুলোবেনা । রবীন্দ্রনাথ একটা আকাশ , আকাশের শেষ হয় না । বরং সারা পৃথিবী সেই আকাশে ডানা মেলে , উন্মাদনায় মেতে থাকে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২০

করোনার ভ্যাকসিন সেপ্টেম্বরে !


অসময়ে কিছুটা হলেও আশা জাগছে , মানুষের মনে । একদিকে প্লাজামা থ্যারাপি যেমন কার্যকরী হয়ে উঠছে - তেমনি প্রতিষেধকের আশা জোগাচ্ছে পুনের সিরাম ইনস্টিটিউট । এই সিরাম ইনস্টিটিউট অস্কফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মেলবন্ধনে করে যাচ্ছে করোনার টিকা আবিষ্কারের কাজ । তাদের দাবি মে মাসের মধ্যে ই তারা ট্রায়াল শুরু করতে পারবে । সেপ্টেম্বরে ভারতে পাওয়া যাবে করোনার টিকা । দাম পড়বে ১০০০ টাকার মতো ।

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২০

সম্পাদকীয় কথা


না আমরা কেউ ভালো নেই । পৃথিবীর কঠিন অসুখ এতো আর সুখের সময় নয় । তবুও সময়ের নিয়ম মেনে দিন যায় , বছর আসে । আজ নববর্ষ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ এ কঠিন সময়ে প্রকাশিত হল " আমার বাংলা পত্রিকা " ব্লগজিনের পয়লা বৈশাখ , এই একলা বৈশাখে যাতে একটু ভালো থাকা যায় , সাজানো হল লেখার ডালি । বন্ধু পড়ুন মতামত জানান - ফটো এবং ভিডোওগ্রাফি বলছে মানে ওই সংবাদ মাধ্যম , সমাজ মাধ্যম দেখাচ্ছে , আমাদের দ্বারা নির্বাচিত সকলে কাজ করছেন , আমরা একটু লক্ ডাউন টা মেনে বাড়িতে থাকি .............. । আর স্বপ্ন দেখি সুস্থ্য পৃথিবীর ।

পুরো সংখ্যাটি সহজে পেতে এই লিংকে যান
https://amarbanglapotrika.blogspot.com/search/label/%E0%A7%A7%20%E0%A6%B2%E0%A6%BE%20%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%96%20%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%96%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%20%E0%A7%A7%E0%A7%AA%E0%A7%A8%E0%A7%AD?m=1

কবিতায় নিজস্বতা - আবদুস সালাম


সমকালের কবিতায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে সুদূর প্রসারী বর্ণচ্ছটা।প্রত‍্যন্তগামী ভাবনার বিচ্ছুরণ। ভাবনার মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে  আনতে হয় কবিতার শরীর। ভাবনা থেকে ভাবনায় ডিঙিয়ে যাওয়া শুধু। ভাবনার ভগ্নাংশ জুড়ে তৈরি হয় কবিতার পঙ্ক্তিমালা। ভাবনার রাস্তা খানাখন্দে ভরা। সাবলীল গতি হোঁচট  খাচ্ছে প্রতি পদে।লাফ দিয়ে ডিঙিয়ে যাওয়া শুধু।
আমরা যারা সাধারণ পাঠক হারিয়ে ফেলেছি খেই। পাচ্ছিনা সঠিক দিশা। প্রায়শই মনে হয় এ যেনো ভাবনার বুনো হরিণ।একে ধরা যায় না কেবলমাত্র চোখে দেখে যায়। ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবনার স্ফুলিঙ্গ দিয়ে বোনা রাতের আকাশ। শরতের পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো ভেসে যাওয়া  টুকরো টুকরো আশা, আকাঙ্ক্ষা। আধুনিক কবিতা বলতে আমরা উপলব্ধি করছি পেঁজা তুলোর মতো ভাবনা বিহীন ভাবনার জারিত কথামালা। যেমন দেবাশীষ সাহা লেখেন "মহিষ আর মেঘের সঙ্গমে জন্ম নিবে আমার উত্তর পুরুষ ।"
"কাঠের স্বপ্ন অনুবাদ করছে গৃহ সজ্জা"
"ঘরে ফিরে রং করি পাখিদের ডানা"
 অসাধারণ সব অনুভূতি যা নতুন প্রজন্মকে কবিতার বনে ভ্রমণ করতে যোগাবে নতুন দিশা।
কবিতায় খুঁজে পাই নির্মাণগত আপাত বিশৃঙ্খলা । স্বাধীন কল্প চিত্রের বেহায়াপনা।এখন মিথের ছড়াছড়ি । বিশ্বাস অবিশ্বাস মিলে মিশে শব্দেরা নির্বাক। কবিতায় এখন খুঁজে পাই সম্মোহনী ধ্বনি প্রবাহের বিচিত্র বুনন। কবিতায় অজন্তা ইলোরার প্রচ্ছদ ভাবনা। কবিতার প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে খেমটা নাচে পাড়া মাত্  করে। অসাবলীল যাত্রাপথে জীবন ভিত্তিক জীবন যন্ত্রণার নানা অভিজ্ঞতার কথা আঁকে উপলব্ধির চিত্র ।
আঙ্গিকের পরিবর্তন এই সময়ের কবিদের  বিশিষ্ট লক্ষণ । অন্তর্দহনে জর্জরিত মানুষের চলার পথ যেমন সাবলীল হয়না তেমনি কবিদের কবিতা ও এখন সাবলীল প্রকাশে ধরা দেয় না।মোহময় উল্কি দিয়ে সাজানো হয় কবিতার শরীর।অনুভূতির বুননকে আমরা অস্বীকার করি কিভাবে?
এই সময়ের একজন  আলোড়ন জাগানো কবি তৈমুর খান এর কবিতায় এখন অন‍্যমনের ছড়া ছড়ি। বাস্তবতার করুন দহনে জর্জরিত ভাষা উগড়ে দেন কবিতার শরীরে।
 "শহরে এসে দেখি,সব মানুষের পিতলের হাত
রূপোলী মুখে বড়  যান্ত্রিক হাসি
আর পা গুলো লোহার,টায়ারের সঙ্গে গড়াতে গড়াতে গোল হয়ে গেছে পিচের রাস্তায়।"।

 "হে বিষগাছ, তোমার তলায় আমাকে পুঁতে রাখলাম
কখনো ফুল ফুটৃলে ডেকে দিও"__
"বাতাসের ডানায় মরুভূমি পার হই,
হা অন্ন দু ঠোঁটে ছড়িয়ে  দিই বিষ
বিষাদ আমার ডাকঘর"

"সঙ্গমের খোলা রাস্তায় বাজনা বেজে ওঠে
বিবাহ উৎসবে নেচে ওঠে রাত
টেবিলে টেবিলে উষ্ণ জল
কামুক কুয়াশার চাউনি
উঁকি দিচ্ছে সালঙ্কারা মেঘ"
    আমাদের অসুবিধা হয়  ।এখন কবিতার ভাষা যেন সেতু হীন যাত্রাপথে স্বপ্ন উড়ান , যেটা বড্ড প্রাসঙ্গিক।কবিগণ ছন্নছাড়া আকাশের বুকে এঁকে দিতে চায় প্রাত‍্যহীক আল্পনা। দিন পাল্টে যাচ্ছে, সময় বদলে যাচ্ছে।   কবিতার ভাষা, আঙ্গিকের কেনই বা পরিবর্তন হবে না?
রবীন্দ্রনাথ ,নজরুলের বিবরণ ধর্মী কবিতা থেকে বেরিয়ে এসে কল্লোল যুগের কিছু কবি যেমন জীবনানন্দ দাশ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়,অমিয় সেন এর মতো প্রতিভাবান কবি বেরিয়ে এলেন চেনা পথ ছেড়ে অচেনার উদ্দেশ্যে । তৈরি করলেন নতুন পথ ।যে পথ  ধরে আমরা পাড়ি দিয়ে চলেছি নতুনের অভিযানে। যতই সমুদ্রের জল লবনাক্ত হোক ,হোক না কেন বিপদসংকুল আমাদের ছোট ডিঙিনিয়ে জয় করবো নতুন দেশ ।
 তারা আমাদের শেখালেন নতুন কবিতার আঙ্গিক, পরিবেশনের কলাকৌশল। আমরা সেই পথে হাঁটতে দেখলাম নব নব কবিদের। একবিংশ শতাব্দীতে  সেই সব কবিদের অসাধারণ সব পঙ্ক্তিমালা।
 যেমন অভ্র দীপ গোস্বামী লিখেছেন  "ধর্ম বিবেকের গলায় পাওয়া গেল ভাঙা মদের গেলাস"।
অমিতাভ দাশ লিখেছেন " মেঘের মতো অভিমান এসে ধাক্কা দিচ্ছে বিষাদ কুটিরে " ।
রোশনি ইসলাম লিখেছেন "  মুসলধারে বৃষ্টি হচ্ছে/সবুজ পাতার উপর পিঁপড়ের পরিবার "___
সমীরণ কুন্ডু লিখেছেন "   লিঙ্গের প্রত‍্যয় দেখে/শিবের সৎকার নিষিদ্ধ হল/উত্তর বিশেষ গবেষণা লিখে রাখে কেউ_"___

তৈমুর খান লিখেছেন  "রোজ মোহ এসে গাভীর মতো দাঁড়ায়/তার দুধের থলি ঝুলে নামে/হামাগুড়ি দিয়ে তার তলপেটের নীচে/হাঁ করে থাকি/জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে চেটে/পান করি অলীক রস___
 রোজ নারীর কাছে যাই/গাছের কাছে যাই/অহংকার ও নম্রতা তুলে দেখি/সহিষ্ণু ও সততা হেসে ওঠে/ তার পর বাতাসে ওড়ায় চুমু_"___
গোলাম রসুল লিখেছেন"নৌকার তলায় শুকিয়ে গেছে শহরের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী   "
 " কি মারাত্মক ভাবে রাত্রি নামছে/শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয় মরার জন্য যে হাসপাতাল বানিয়েছে/আমরা তার উপর প্রচন্ড মেঘ"____
"আমি দেখছিলাম পোশাক খোলা আমার ছায়া"___
ফজলুল হক লিখেছেন"অন্ধকারের অলৌকিক পুরুষ আমি/একান্তে ভিক্ষে চাই সূর্যের আলো/পুড়ে যাবে আকাঙ্ক্ষার জ্বালামুখ/ছায়া হীন পিপাসা কাতর চুম্বন রাত্রি"___
মাসাদুর রহমান লিখেছেন "পৃথিবীর প্রতিটি দিন শান্ত গ্রামের প্রান্তে বসে/দেখে/ধান ক্ষেতে আশ্চর্য বাতাস নিয়ে ফিরে আসছে বিভূতিভূষণ"____
প্রবীর চক্রবর্তী লিখেছেন "কোনো কোনো অসুখের চূড়ায় দাঁড়িয়ে/শহর দেখতে গিয়ে পা হড়কে/পড়ে গেছি মৃত্যুর দিকে/চারপাশে প্রিয় জন বিষন্ন চোখের তারায়/পিছনের পথ"____
সৌরভ হোসেন লিখেছেন"হাসপাতাল থেকে ফিরে আসে যেটুকু সুখ/তার ভেতর আমাদের আকাশ/আমাদের যাপন, আমাদের সংসার /অসুখ কখনো আপনার হয়না/অথচ অসুখের ভেতরেই আমাদের বাস, আমাদের রোদবৃষ্টি/আমাদের নাগরদোলা"__
আবদুস সালাম লিখেছেন"সময়ের স্রোতে বয় শুনশান শূন্য বাতাস/চোখ জুড়ে নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার/বিষন্ন উৎসবের আড়ালে খসে অস্তিত্বের খোলশ/অনিবার্য অন্ধকারে ভাসে বিবর্ণতা র সংকেত"___
"একটা ধূসর শূন্যতার বুকে মাথা গুঁজে আছি/শিয়রে বসে পাহারা দিচ্ছে মহাকাল/বিবেকের পাঠশালায় ঝর্ণার বিজ্ঞাপন/নষ্ট আকাঙ্ক্ষার আমন্ত্রণে জড়ো হয় পাপ"___
 সাহিত্য চর্চার বিষয় টি এখনো বিছুটি পাতার মতো অচ্ছ‍্যুৎ। সাহিত্যে হেরে যাওয়ার কিছু নেই। সাহিত্য একটা দুরন্ত নদীর মতো চঞ্চল।যখন জেগে ওঠে তখন বসন্ত সমাগত হয়।দুর্ভাগা সুন্দর যেমন মাটি কামড়ে পড়ে থাকে।
কবিতা মনের ভূবনে নানা রকম ফুল ফোটায়। মানুষের মন যেমন ভিন্ন,মনন ও তেমনি ভিন্ন। কবিতায় কবির ভাবনা ও তেমনি ভিন্ন। ভিন্নতা আছে বলেই কবিতার ভিন্নতা আমরা লক্ষ্য করি। লক্ষ্য করি ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির, ভিন্ন ভিন্ন রসের কবিতা আমরা দেখতে পাই।  নিমফুলের মধু,  আমফুলের যেমন ভিন্ন, তেমনি কবিদের  কবিতা ও তেমনি ভিন্ন ভিন্ন ।
 বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও কবিতা নিজস্ব স্বত্তা বজায় রেখে আপন গতিতে,আপন মনে এগিয়ে চলেছে।শ্রদ্ধার চোরাবালিতে আবেগ মথিত হৃদয়ের যন্ত্রণা মন্ডিত শব্দ মঞ্জরীই কবিতার প্রাণ। গর্ভ যন্ত্রণার মুক্তিই কবিতার স্বরূপ।

পূরণ তীর্থঙ্কর সুমিত


কয়েকটা শূন্য
ঘর দখলের জন্য দাঁড়িয়ে আছে
একের পিঠে দুইয়ের বোঝা
দুইয়ের পিঠে চার
ক্রমশ এগোচ্ছে
এক পা দু পা
আর কয়েক পা এগোলেই
একটা সুন্দর সকাল
এভাবেই ফিরে আসে
কত ...
একটা সকাল লিখি
শূন্যতা পূরণ করবো বলে।

মানবপক্ষ - প্রদ্যোত আশ


বন্ধু আমি তো স্বপ্ন দেখেছিলাম
আমাগো আর কেউ মালাউন কইবা না
তোমার সাথে ঘর ছেড়েছি আমি
অর্ধাহারে ঝড়ো রাইফেল কাঁধে
জয় বাংলা , জয় বাংলা , বাংলার জয় হবেই
অবশেষে বিজয় দিবস এল বাংলা তোমার রাষ্ট্র ভাষা হল
তারপরেও থেমে থাকল কই আমার মাটিতে মালাউন বিদ্বেষ
তারপর তো বিরানব্বই এল আমি চলে এনু এপার বাংলায়
ভোটার , আধার সবকিছুই তো আছে তবু ও শুনছি ওগুলোর দাম নাই
কেউবা বলছে NPR হলে আমারাই নাকি লাভবান হব বেশি
বন্ধু তবু তো স্বপ্ন দেখেছিনু আমাগো কেউ মালাউন কইবা না
এখনো আমি বাংলা মিছিলে হাঁটি কত পরিচিত শহিদরা মনে আসে
আজো কিন্তু স্বপ্ন দেখে যায় সব রাষ্ট্রই মানবপক্ষ নেবে

লঙ্কাকাণ্ড : একটি অসমাপ্ত ধারাবিবরণী - মধুসূদন দরিপা



এক হি নারা এক হি নাম
জয় শ্রীরাম জয় শ্রীরাম
প্রশান্ত মহাসাগরের আকাশ থেকে উড়ে এসেছেন শ্রীরামচন্দ্র
সঙ্গী তাঁর সীতা মেলানিয়া
এই মুহূর্তে কমলালেবু আর পেয়ারার রসে এবং ডাবের জলে গলা ভেজাচ্ছেন রাজধানীতে বসে
ওদিকে মৌজপুর বাবরপুরে প্রজারা বিদ্রোহ করেছেন বলে খবর এসেছে
চাঁদবাগে খুন হয়েছেন মহম্মদ ফুকরান, শাহিদ
' এখান থেকে গাড়ি সরিয়ে নিন,
যেকোনও সময় আগুন জ্বলবে '
' হেই ! মাচিস কাঁহা হ্যায় '
চারটে দোকান দুটো বাড়ি জ্বলে উঠলো জাফরাবাদে
একই সঙ্গে রাজবাড়ির হেঁসেলে জ্বলে উঠলো আভেন
সাত ধরণের চা তৈরী হবে
আমেরিকান, ইংলিশ, আর্ল গ্রে, দার্জিলিং, অসম, গ্রিন আর লেমন
এদিকে এক মনে পুড়ে চলেছে রোম, নোয়াখালি, কলকাতা, অযোধ্যা, গোধরা, দিল্লী
এক মনে বেহালা বাজিয়ে  চলেছেন সম্রাট  নিরো
রঘুপতি রাঘব রাজা রাম
সেভেন গ্রেন কুকিজ আর রোস্টেড আমন্ড সহকারে আর্ল গ্রে টি-র কাপে চুমুক দিচ্ছেন
পতিতপাবন সীতারাম
এইমাত্র খবর পাওয়া গেলো
রবিবার মাঝরাতে বানরসেনারা উড়ে এসে দুই পুষ্পকরথ সমুদ্রশিলা নামিয়েছে
এবং শিলার আঘাতে গোকুলপুরীর হেড কনেস্টবল রতনলালের মৃত্যু হয়েছে
খবর শোনা বন্ধ করে শ্রীরামচন্দ্র এক মনে  খামান ও ভুট্টার সিঙ্গাড়া খেতে শুরু করলেন
ওদিকে এক মনে পুড়ে চলেছে রোম, নোয়াখালি, কলকাতা, অযোধ্যা, গোধরা, দিল্লী
এক মনে বেহালা বাজিয়ে চলেছেন সম্রাট নিরো
রঘুপতি রাঘব রাজা রাম
পতিত পাবন সীতারাম

নীরা কালসীমাহীন অনন্তের প্রজ্ঞা - তৈমুর খান



 সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা আত্মঅন্বেষার এক  নিগূঢ় জাগরণ। যতই তাকে রক্ত মাংসের মধ্যে খোঁজা হোক না কেন ,যতই তাকে নারীরূপে দেখানো হোক না কেন, সুনীলের আর এক সত্তা  'মনের মানুষ'কে আরশিনগরেই উপলব্ধি করা যায়। কেউ বলে 'রানি' ,কেউ বলে 'নারী' ,কেউ বলে 'প্রেমিকা' —আসলে কেউই ঠিক বলতে পারে না। কবির বাউল সত্তায় সহজিয়া এক বোধের তীব্র আকুলতা এই নীরার জন্ম দিয়েছে। বাস্তবের স্পর্শে তাকে স্পর্শ করার তাগিদ জেগে উঠলেও তাই নীরা কখনো  বাস্তব হয়ে ওঠেনি। এক দুর্মর রহস্যের অন্তরালেই সে বিরাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথের 'রাজা' নাটকে রানি রাজাকে কখনো দেখতে পায়নি। কখনো হাত দিয়ে ধরতে পারেনি ,অথচ রানি জানে রাজা আছে। রাজার কঠিন কোমল রূপও আছে। একটা ধারণার ব্যাপ্তি অনন্তের মহাসমারোহে বিরাজ করেছে। নীরাও এই অনন্ত প্রেমের আধার ,অনন্ত নারীর আধার। সমূহ ধারণার অভিব্যক্তিতে তার উপস্থিতি এবং রহস্যময় গতিবিধির দোলাচল। নীরা বিষয়ক কবিতাগুলি সেই অভিমুখেই প্রক্ষিপ্ত এবং ব্যাপ্ত। জীবনানন্দ দাশের হাজার বছরের পথ হাঁটা এবং অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়া যেমন বনলতা সেনের কার্যকারণে প্রতিফলিত অনন্ত জন্মের ঘোর, এই নীরাও তেমনি সমস্ত পুরুষ হৃদয়েরই নিবেদিত আশ্চর্য এক প্রেমের দীপ্তি  যাকে ধরা যায় না অথচ মনে হয় হাতের নাগালেই অবস্থিত। যাকে উপলব্ধি করা যায় ,মনের চোখ দিয়ে দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবের রক্ত-মাংস-মজ্জায় প্রকৃতিস্থ করা যায় না। আসলে মনের মানুষ তো মনেই থাকে ,মনের বাহিরে তাকে টেনে এনে দাঁড় করানোই কবির সাধনা।
         সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রেমের কবি, মিস্টিক চেতনার কবি। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মরমিয়া ভাবালুতা। দেহকে উপলক্ষ করে দেহের বাহিরে অর্থাৎ দেহাতীত হওয়া। কামকে পবিত্র প্রেমের আলোয় পরিণত করা। ষাঁড়ের  মাথায় লাল কাপড় বাঁধলেও তিনি পূজার জন্য ১০৮ টা নীলপদ্ম তুলতে ভোলেন না। ঘুমন্ত কুমারীর ঊরুতে রাখেন কামহীন হাত। ভালোবাসা বলতে শুধু সুখ নয়, তিনি নির্বাসনকেই বোঝেন । সেই কবি যখন নীরার কাছে হাঁটুমুড়ে বসেন তখন সঙ্গম প্রার্থনা করতে নয়, পূজা করতে,আত্মনিবেদন জানাতে। ভোগের শরীরী মাধুর্যে তাকে লাভ করা কবির উদ্দেশ্য নয়। 'আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি' কাব্যের বেশ কয়েকটি কবিতায় নীরার ব্যাপ্তি এবং মিস্টিক বোধের পর্যায়টি প্রথম থেকেই জানিয়ে দেন। 'হঠাৎ নীরার জন্য' কবিতার প্রথম পঙক্তিটিই  মহাকালের দরজা খোলে :
"বাসস্টপে দেখা হল তিন মিনিট অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে                      বহুক্ষণ"
 'তিন মিনিট' কয়েকটি মুহূর্ত মাত্র ,কিন্তু মুহূর্তই তো  মহাকালের অংশ। এই মুহূর্তই স্বপ্নের বহুক্ষণ ধারণ করল। 'বহুক্ষণ' যে অনন্তকাল  অর্থাৎ মহাকালের সমারোহে  অভিগত সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা পরবর্তী অংশে কবি ব্যাখ্যা করলেন :
"দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে
দিকচিহ্নহীন--
 বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর,হাওয়ার ভিতরে
 তোমাকে দেখেছি কাল স্বপ্নে ,নীরা ,ওষধি স্বপ্নের
নীল দুঃসময়ে।"
 'দিকচিহ্নহীন' শব্দটিতে ব্যাপ্তির অনন্ত প্রসারকে তুলে দিলেন, তেমনি 'বাহান্নতীর্থের মতো এক শরীর'  লিখে দেবী মহামায়ার স্বরূপকে  উন্মোচিত করলেন। এই নীরা তো সেই নীরাই যাকে কাল সীমানাহীন অনন্তের আধারে উপলব্ধি করা যায় ।
         এই কবিতাতেই 'তুমি' সর্বনামটি ব্যবহার করে নীরাকে মানবীর এক সম্বোধনের বলয় কবি তৈরি করতে চেয়েছেন। আসলে অনন্তের প্রজ্ঞাকে ধরতে চেয়েছেন। নিজস্ব করে তুলতে চেয়েছেন । রামকৃষ্ণদেবের মতো মান-অভিমানের ভেতর একাত্ম করে গড়তে  চেয়েছেন। এসবই সাধনায় উৎসারিত উপলব্ধির ভাষা। সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরি করা মাত্র।কবি যখন বলেন :
" তুমি আজই  কি ফিরেছো ?"
 তখন তো মানবীর জিজ্ঞাসাই  হয়ে ওঠে, কিন্তু অনন্ত রহস্যকে আপন করে তুলতে তো এই ভাষাই  ব্যবহার করতে হয়। রামকৃষ্ণদেব তো 'শ্যামা মা'কে এই ভাষাতেই কথা বলতেন। কবি সচকিত হয়ে দেখেন : 'তোমার দিগন্ত, দুই ঊরু ডুবে  গেছে নীল জলে' —তখন তো 'তোমার' সর্বনামটিও কোনো নারীর হতে পারে না, কারণ দিগন্ত এবং দিগন্তের নীল নারী নয়, অনন্তময়ী শক্তির আধার ।এই শক্তিকেই সুনীল পূজা করেছেন।শিল্পী Hans Hofmann  এই মিস্টিক চেতনা সম্পর্কে বলেছেন :  "The whole world, as  we experience it  visually, comes to us   through  the Mystic realm of color"
 অর্থাৎ  পুরো বিশ্ব, যেমনটি আমরা এটি দৃশ্যত অনুভব করি, রঙের রহস্যময়  অঞ্চলের  মাধ্যমে আমাদের কাছে তা আসে । সমগ্র বিশ্বেই ছড়িয়ে আছে যে রং  তা তো মিস্টিক চেতনারই রং । কবিও যা দেখেন ,শিল্পীও তাই দেখেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই  রংকেই কবিতায় 'নীলজল' হিসেবে পেয়েছেন। জার্মান ও  অামেরিকান শিল্পীর এই মিস্টিক বোধের অভিজ্ঞতাই  'নীরা' বিষয়ক কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। মিস্টিক চেতনার রাজত্বে সব নারীর মুখেই নীরার প্রতিফলন ঘটেছে। সব কথাতেই  নীরার কথা হয়ে উঠেছে। একীভূত এই পর্যায়টিকেই কবিতায় বারবার তুলে ধরেছেন। 'অপমান এবং নীরাকে উত্তর'  কবিতাতেও দেখা যায় এই পরিচয় :
" সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কেন হেসে উঠলে সাক্ষী রইল বন্ধু তিনজন"
 সেই মানবীর ক্রিয়ারই সমীক্ষণ। স্পর্শ করা থেকে ঘ্রাণ নেওয়া সবেতেই কবি তার আবহাওয়াটি রচনা করেছেন। 'নীরার জন্য কবিতার ভূমিকা'তেই বোঝা যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নীরাসত্তার ভেতর কীভাবে নিজেকে ছড়িয়ে রেখেছেন। যাবতীয় সৃষ্টিতেই নীরার অভিক্ষেপ যেমন, তেমনি দৃশ্য এবং অদৃশ্য প্রজ্ঞার মধ্যেও  নীরার জাগরণ ও অবস্থিতি নিগূঢ়ভাবে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছে। নীরা যে পবিত্র এক আত্মার ধারণা ,ভোগের কামমুহূর্ত নয়, কবি  তা খোলসা করেছেন :
"আমার সম্পূর্ণ আবেগ
 শুধু মোমবাতির আলোর মতো ভদ্র হিম,
                  শব্দ ও অক্ষরে কবিতায়
 তোমার শিয়রের কাছে যাবে— এরা তোমাকে
চুম্বন করলেও
 তুমি টের পাবে না, এরা তোমার সঙ্গে সারারাত
 শুয়ে থাকবে
 এক বিছানায়—তুমি জেগে উঠবে না, সকালবেলা
 তোমার

 পায়ের কাছে মরা প্রজাপতির মতো এরা লুটোবে।
 এদের আত্মা মিশে
থাকবে তোমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে, চিরজীবনের মতো

বহুদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলে ঝর্ণার জলের মতো
হেসে উঠবে কিছুই না জেনে। নীরা ,আমি তোমার অমন

 সুন্দর মুখে বাঁকা টিপের দিকে চেয়ে থাকবো ।
 আমি অন্য কথা
বলার সময় তোমার প্রস্ফুটিত মুখখানি আদর
করব মনে মনে
ঘরভর্তি লোকের মধ্যেও আমি তোমার দিকে
                              নিজস্ব চোখে তাকাবো।
 তুমি জানতে পারবে না —তোমার সম্পূর্ণ শরীরে
 মিশে আছে
 আমার একটি ব্যক্তিগত কবিতার প্রতিটি
শব্দের আত্মা।"

       একই দেহে দুই সত্তার বসতি। এক সত্তা যেন আর এক সত্তাকে দ্যাখে। এই সত্তা আর এক সত্তাকে কবিতায় নিরীক্ষণ করে। সেই সত্তাই তো শক্তির উৎস। নিজেকে নিজেই আদর করা, চুম্বন করা ,একই বিছানায় শুয়ে থাকা, পায়ের কাছে মরা প্রজাপতি হয়ে লুটানো । চিরজীবনের মতো আত্মায় মিশে থাকা আর কে হতে পারে?  সেই সত্তাকেই খুঁজে পেতে চেয়েছেন নিজের মধ্যে। জলের মতো কখনো হেসে উঠে, কখনো সুন্দর মুখে বাঁকানো টিপের দিকে চেয়ে থেকে, আত্মপ্রেমের গভীর পর্যায়টি নার্সিসিজমে পৌঁছাতে চেয়েছে ।বিখ্যাত দার্শনিক  Erich Fromm তাঁর The Art of Loving -এ বলেছেন :"I must try to see the difference between my picture of a person and his behavior, as it is narcissistically distorted, and the person's reality as it exists regardless of my interests, needs and fears.”   অর্থাৎ আমার অবশ্যই একজন ব্যক্তির আমার ছবি এবং তার আচরণের মধ্যে পার্থক্য দেখার চেষ্টা করতে হবে, কারণ এটি ন্যারিসিস্টিস্টিকভাবে বিকৃত, এবং ব্যক্তির বাস্তবতা যেমন রয়েছে তা আমার আগ্রহ, চাহিদা এবং ভয় নির্বিশেষে বিদ্যমান।  শিল্পীর স্বীকারোক্তির মধ্যদিয়েই কবিরও সত্তার এই রূপের ভিন্নতা রয়েছে। নিজেকে নিজের মতো করেই সেই সত্তার নির্মাণে উপস্থিত করেছেন। তার পবিত্রতা ধরে রাখতে চেয়েছেন। নীরা যে প্রেরণা দিতে পারে, নির্বিকল্প মানুষ করে তুলতে পারে সে কথাও জানান কবি। 'এসেছি দৈব পিকনিকে' কাব্যের 'নীরার কাছে' কবিতায় তাই বলেছেন :  'যেই দরজা খুললে আমি জন্তু থেকে মানুষ হলাম।' এই বিবেকের জাগরণ তো একটা নতুন রূপান্তর কবিসত্তার। কবিকে নির্মোহ করে গড়ে তুলেছে। 'সোনার মুকুট থেকে'  কাব্যের 'নীরা তুমি' কবিতায় কবি দার্শনিক হয়ে গেছেন। যে নদীর সহবাসে কবির দিন কাটে সে গৌতম বুদ্ধকেও  দেখেছিল। কবি যে সেই দীক্ষিত তপস্বী হয়ে উঠেছেন তা বলাই বাহুল্য। 'আকাশ পোশাক হতে বাকি নেই' বলেই কবি মহাশূন্যের বিস্তারে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
       'বাতাসে কিসের ডাক শোনো' কাব্যে 'নীরা তুমি কালের মন্দিরে' কবিতায় নিজের আত্মবিষাদের  ভেতর  নীরার বিষাদকে স্পর্শ করেছেন। নীরা  প্রকৃতির বিস্ময় নিয়ে জেগে থেকেছে। অর্থাৎ কবি নিজেকে প্রকৃতির ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাই ব্যক্তিবোধ এখানে নেই। প্রকৃতি চেতনায় নীরা আরও দূরগামী, রহস্যময়ী :
" অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানালো
 আঁচলে বৃষ্টির শব্দ ,ভুরুর বিভঙ্গে লতাপাতা
ও যে বহুদূর,
 পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর
 ওখানে কী করে যাবো ,কী করে নীরাকে
                              খুঁজে পাব?"
 সত্তার এই বিস্তার মৃত্যুচেতনা অথবা আবহমান পঞ্চভূতে বিলীন হওয়ারই নামান্তর। তখন তো ব্যক্তি থাকে না ।নীরা নামে কোনো একক বিশেষ্য কবির নিজস্ব আরাধ্য হতে পারে না । স্বাভাবিকভাবেই সংশয় জেগে উঠেছে। প্রাণের আকুলতাও দেখা দিয়েছে। 'জাদুকরী জাদুকরী'  শব্দটির দ্বিরুক্তিতে তা স্পষ্ট । 'সেই মুহূর্তে নীরা' কাব্যের নাম কবিতায় লিখলেন:
"অমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকো একটুক্ষণ, নীরা
 যেন অলীক না মনে হয়
                                মিলিয়ে যেও না"
 প্রাণের ঐশ্বর্যে ,ভাবনার সংরাগে এবং কল্পনার মহিমায় যাকে  আত্মস্থিত ব্যঞ্জনায় সংগঠিত করা যায় ,তাকে তো দুচোখ ভরে কবি দেখতেই ভালোবাসেন। হারিয়ে না যাওয়ার আকুলতা এই কারণেই। কিন্তু সময়ের প্রবল স্রোতে তা ভেসে যায়। অনন্ত কি স্থির হতে পারে ?
      আত্মরতির ছায়া যত দীর্ঘই  হোক তা  শূন্যতায়   গিয়ে একসময় বিলীন হয়ে যায় ।  যা সত্য তাই পড়ে থাকে তা হল প্রাণের আকুলতা ।  'সত্যবদ্ধ অভিযানে' কবি লিখেছেন :
" এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?"
এই বিবেক জাগ্রত করার পক্ষে নীরারই প্রয়োজন ছিল। শরীরকে পেয়েও ত্যাগ করা এবং পার্থিব আসক্তি থেকে মুক্তির সোপানে উপনীত হওয়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাব্যের মূল বিষয়। তাঁর জীবন সাধনায় নীরার টংকার সেই প্রেরণা হিসেবেই প্রাপ্ত হয়েছে। কবি স্বীকার করেছেন :
“নীরা, তোমার কাছে আমি নীরার জন্যে রয়ে গেলাম চিরৠণী—"
   নীরার কাছে নীরার জন্য ৠণী হওয়া বলাতেই বোঝা যায়, এই নীরা বাইরের কেহ নয়। রবীন্দ্রনাথের মতো 'অন্তর মাঝে অন্তরতম' এই নীরা। Hans Hofmann তাঁর আর্টিস্ট জীবন নিয়ে বলতে গিয়ে যেন একথাই বলেছেন :
 "My aim in painting as in art in general is to create pulsating, luminous and open surfaces that emanate a mystic light, determined exclusively through painterly development, and in accordance with my deepest insight into the experience of light and nature."
অর্থাৎ "সাধারণভাবে শিল্পের মতো পেইন্টিংয়ের আমার লক্ষ্যটি হ'ল স্নিগ্ধ আলো, উদ্দীপনা এবং উন্মুক্ত পৃষ্ঠগুলি তৈরি করা যা একটি মরমী আলো উদ্ভাসিত করে, প্রকৃতির অভিজ্ঞতার আমার গভীর অন্তর্দৃষ্টি অনুসারে।
 প্রকৃতি এবং জীবনই কবি ও শিল্পীকে চিরদিন ভেতর থেকে প্রেরণা দিতে পারে। স্পন্দিত ভাস্বর করে তুলতে পারে।  `চোখে স্বর্গ স্মৃতি' এবং `ওষ্ঠে অমরতা'র চিহ্ন কবি দেখতে পেয়েছিলেন যা Pulsating এবং Luminous এর ধারক হয়ে উঠেছিল। তাই নীরা হৃদয়জাত এক অতিশরীরী বোধের চিরন্তন ও অমোঘ শক্তি —যার রূপ দেখার ক্ষমতা একজন প্রকৃত শিল্পীরই থাকে। 

এক আকাশ তারার নিচে - সুপর্না দাঁ


এক আকাশ তারার নিচে
শুধুই কি অন্ধকার?
নাকি কিছু আলো অবশিষ্ট আছে...

বছরশেষের হিসেব খাতায়
শুধুই কি হারানো?
নাকি কিছু ফিরে পাওয়াও আছে...

আছে আছে..... অনেক কিছুই আছে
আছে স্মৃতি, আছে স্বপ্ন ,আছে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।।

আছে মেঠোপথ ,আছে খোলা হাওয়া
আছে সহাস্যমুখে ফেরা
আছে বন্ধুত্ব, আছে বিশ্বাস, আছে ভালোবাসা।।

যা  যাওয়ার তা গেছে
তা নিয়ে নাইবা ভাবলাম
যা আছে তাই নিয়েই শুরু হোক
 নতুন বছরের আগমনী পথ।।

শুধু বসন্ত'কে ছুঁতে চেয়ে - অরুণাভ নিয়োগী।


আজকাল বৃষ্টি পড়লেই ভাঙা দেওয়ালে
মেঘ আটকে যায়,উঠোন জুড়ে ঝিমিয়ে পড়ে
ক্যাচক্যাচে কাদা,খড়ের জল।

আজকাল বৃষ্টি পড়লেই সাদা পাতায় জমা হয়
মনখারাপ, হারমোনিয়ামের রিড বিষাদ ছড়ায়,
সবুজ মাঠ চিরে ট্রেনের কামরায় কান্না ছুটে যায়।

আজকাল বৃষ্টিরা প্রায়ই পথ হারায়
গলিপথে গিয়ে আটকে যায় ঢেউ, ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তোলে হাঁটুর কাছে, কুয়োতে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে চোরা স্রোত।

আজকাল বৃষ্টিরা কখনও কখনও না বলেই আসে,
না বলেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় দু'ফসলি জমি, সবুজ আল,ভরা মরাই আর খড়ের চালা।

আজকাল বৃষ্টিরা এসে ছুঁতে চায় শিমূলের ডাল,
পলাশ পাতা, অশোকের পাপড়িকে,
ছুঁতে চায় কোকিলের কালো ডানা, ঘেঁটু ফুল।

আজকাল মেঘেরা রোজ বৃষ্টি হয়, শুধু বসন্ত'কে ছুঁতে চেয়ে।
 ----
                                     

বাস্তবতা আর কল্পপ্রাণ - ব্রততী পরামাণিক



নিজের খেয়ালে ভেসে চলে স্রোতে
ইচ্ছা-অনিচ্ছার মিল-অমিলে
দায়বদ্ধ জীবন শোনে না বারণ
     অকারণ,অবুঝ নয়ন-
     যারে যা উড়ে পাখি
     শিকল খোলা মন নিয়ে
হোক না হোক কোনো বাঁধন
      তাও চলে যাও বহুদূরেই...
       স্বপ্ন গুলো ইচ্ছে নিয়েই
       কল্পনাতে থাক বেঁধে
       কল্পনা তো ব্যাপ্তি নিয়েই-
       না হোক পূর্ণ- মনখারাপ?
   খারাপ মনেই আগলে রাখো
       বাস্তবতা আর কল্পপ্রাণ ।

পুরাতন তুমি - পৃথ্বীরাজ


 চোখের কোনে আটকে থাকা জল থেকে ঘ্রাণ ভেসে আসে তোমার।
এখনো মাঝে মাঝে সেই রেললাইনে চড়ে হাঁটার চেষ্টা করি। শুধু আগের মতো হাত ধরার কেউ থাকে না।
সেই পুরোনো জামাটা লোক লজ্জার মাথা খেয়েও মাঝে মাঝে পড়তে ইচ্ছে করে,
কেননা সেই জামার কলারে লেগে থাকা ঘামে তুমি ঠোঁট ছুঁইয়েছিলে।
তোমার চুমুর স্পর্শ আমি আজও পাই।
আজও মাঝে মাঝে টিকিট না কেটেই ট্রেন কামরায় উঠে পড়ি, জানালার ধারের সিটে বসে নীরবতা পান করি,
শুধু তোমার স্মৃতি গুলোকে হৃদয় হলে বন্দি রাখার জন্য।
বিশ্বাস করো আমি আজও সিগারেটর ধোঁয়াকে আমার নাগাল পেতে দিই নি,
সেই যে তুমি বলেছিলে সিগারেটের ধোঁয়া তোমার একদম সহ্য হয় না।
আমি আজও তোমার সেই তুমিই রয়েগেছি,
কিন্তু তুমি কি একটি বারের জন্যেও আমার কথা ভাবো?
না তো জানি তোমার আর সময় কোথায়?
কত বড় সংসার, কত দায়িত্ব।
আচ্ছা তোমার সমস্ত দায়িত্বের অবসান হয়ে যখন নীরবে ঝিমানো অন্ধকারে তুমি বসো তখনও কি তুমি পুরাতন?
জানি ভীষণ পুরাতন। পুরাতন তুমি। 

শামুক ভাঙা কেউটে - দিয়াস


আমি সিউরি বিদ্যাসাগর কলেজে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স নিয়ে পড়ি।প্রতিদিন গ্রাম থেকে যাতায়ত করি। আমাদের গ্রাম থেকে
সাত কিমির মতো রাস্তা হেঁটে বাস ধরতে হয়। বাসে দেড় ঘন্টা সিউরি যেতে সময় লাগে।
আমাদের গ্রাম থেকে বের হয়ে দুই কিমি রাস্তা যাওয়ার পর আবার একটা গ্রাম পড়ে। যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে পুরো পথটায় ছিল মেঠো আল পথ। এই পথের মাঝে তিন চারটে ছোট বড়ো পুকুর পড়তো। পুকুরের পাড় থেকে নেমে আবার আল পথ। 
এই রাস্তায় সবচেয়ে বড়ো পুকুরটার নাম ছিল বড়োবাঁদ। এই পুকুরটার দুই পাশের মাঠ গুলোতে একটি বিশেষ প্রজাতির সাপ আছে বলে শুনেছি। এই সাপগুলোকে ওখানে বলা হত শামুক ভাঙা কেউটে। এরা কারো অস্তিত্ব টের পেলেই আগে থেকে তাড়া করে গিয়ে ছোবল দিত। এই প্রজাতির সাপ যেমন বিষধর তেমনি হিংস্র।
বর্ষাকালে একদিন শেষ বিকালের দিকে খুব মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে  বাসস্ট্যান্ডে নামতে আমার সন্ধ্যা হয়ে গেল  তখনও
 আকাশে কালো মেঘ আছে। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি তিন ভাগ রাস্তা পেরিয়ে বড়োবাদের আগের মাঠগুলোতে এসেছি। হঠাৎ করে আমার পা পিছলে গেল। এই সময় মাঠের মাটি আলে তুলে দেয়। তাতেই পা পিছলে এই বিপত্তি।
আমি যেই মাঠে পড়েছি,সাথে সাথেই মাঠের অন্যদিক থেকে জলে কিলবিল করে আওয়াজ। আমি বুঝতে পারলাম শামুক ভাঙা কেউটে আসছে। আমি তড়িমরি করে আলে উঠে এলাম। কিন্তু, আমার একপাটি হাওয়ায় চটি মাঠে গেঁথে রয়ে গেল। কাল সকালে বোঝা যাবে না কোন মাঠে হয়েছে। আবার চটি না পেলে ছমাসেও দ্বিতীয় চটি পাওয়া যাবে না। কলেজ যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। তাই আমি মাঠের আলে কোনরকম নড়াচড়া না করে দাঁড়িয়ে  রইলাম। মনে মনে মা মনসার নাম জপ করছি। অপেক্ষা করছি কখন একটা জোরে বিদ্যুৎ চমকাবে। আমি দেখতে পাব মাঠের ঘোলা জল কোন খান থেকে আসছে। ঝপ করে নেমে সেখান থেকে চটি তুলে নিতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খুব জোর বিদ্যুতের ঝলকানি। আমি ঝপাস করে চটি তুলে নিয়ে আপাতত ভরতের মতো খরম মাথায় দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম।

এইতো সেদিন - অরূপ কুমার গোপ মণ্ডল


এইতো সেদিন বসন্তে,
 তোমার চোখে প্রথম আমার চোখ ।
কাঁটা চিনে , কনক  লতায় করেছিলাম ভর।

 অলির মত রাঙ্গিয়ে দিলে অধর,
মালির মত হাতের উপর হাত।
কথার মালায় হারিয়ে যেত প্রহর।

 ভালোবাসার ভেলায় বসে ,
তুমি হতে- অভিমানী কাঁসাই।
আজকে সেসব খুব পুরানো নয়।

এমনকি আর হলো ?
বদলে গেল ভালবাসার প্রহর গুলো।

 এখন তোমার আতঙ্কে দিন কাটে ।
আমার মনে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাধ।

হাজার বছর বাঁচার আমার সাধ ছিল না মনে ।
হাল ছেড়োনা ,পাল তুলে দাও কষে।

অতিথি দেব ভব - রিঙ্কু চট্টোপাধ্যায়



আগের দিনে পাননি খাবার, করিনি কোন আপ্যায়ন,
তাইতো তিনি খাটের পায়াতে করেছেন দন্ত ঘর্ষন।
 তিনি আসবেন,তার জন্য
আয়োজন করে সম্পূর্ণ,
জানালা দিলাম খুলে-
উত্তুরে বায়, ঠান্ডা লাগায়
তবু তো তাঁর অপেক্ষায়
পাত্র ভরেছি জলে।
রেখেছি খাঁচায় টমেটো, তাঁর প্রিয় ফল জেনে-
কোকো পাউডার, আর প্যারিসের মিশ্রনে
কিছু চাল গম দিলাম ছড়িয়ে।
গত রাতে তাঁর দাঁতের ধারে
 ঘুম কেড়েছিল,  শব্দের জোরে-
তাই আয়োজন আজ রাতে,ডেকেছি দু হাত বাড়িয়ে।
অপেক্ষায়  থেকে থেকে চোখ যে এল জড়িয়ে,


ভাবছি  যখন বৃথা আয়োজন,
কেন এলেননা,কি হল?
শোবার ঘরে, এতদিন ধরে
এত দাপাদাপি শব্দের শান,
ভবলীলা তাঁর সাঙ্গ হল কি?
কার হাতে গেল, প্রান?
হঠাৎ  চেয়ে সিঁড়িঘরে দেখি
রয়েছে তার প্রমান,
তিনিএসেছেন,গান গেয়েছেন
দাঁতগুলি করে ক্ষয়মান।
বিগবাজারে কেনা,নতুন জামাখানা
পরেছি  হাতে গোনা।
দর্জির কাছে দেব বলে
 রেখেছি ব্যাগের ভেতরে,
সে ব্যাগ ছিল সাইকেলে-
ঝুড়ির ওপরে
তার দফারফা,সাঙ্গ করেছেন
কেটেছেন এখানে ওখানে,
এত আয়োজন  নিষ্ফল  হল,
এমন হবে তা কে জানে!
ঘরের ভেতরে অতিথি  না এসে
সিঁড়ি ঘরে তার স্বাক্ষর,
আমরা জব্দ করতে গিয়ে
হলাম নাকাল জব্বর।
পুনর্মূষিক  হবার জন্য আবার পেতেছি ফাঁদ,
তিনি যে চতুর,
চেখে দেখবেন কি,
 প্যারিসকোকোর  স্বাদ?

সন্মান - নরেন সেনগুপ্ত



মানি লোকের মান।
আর গুণির সন্মান।
এ যেনো ঈশ্বরের দান।
সন্মান হাটে বাজারে কেনাবেচা হয় না।
জীবনে অর্জন করে গ্রহন করতে হয়।
অর্থ দিয়ে অর্থ আসে।
অর্থ দিয়ে সন্মান কভু না আসে।
নিজস্ব ভালো কর্ম দিয়া সন্মান আনা যায়।
সন্মান দিলেই বন্ধু সন্মান পাওয়া যায়।
তাইতো জীবনে বাঁচতে একটু মান সন্মান চাই।

আবার দেখা - সারদামণি মণ্ডল


তানপুরা টার তার গুলো
বাঁধা আছে একই সুরে।
শুধু বছরের পর বছর জমছে ধূলো।

দেখতে দেখতে একটা যুগ....
আয়নার সামনে দাঁড়ালে উঁকি দেয়
কালো চুলের মাঝে রূপোলি রেখা।
তবুও মনের ক্যানভাসে স্মৃতির আসা-যাওয়া।

শূন্য উদাস মনে-
তাকায় যখন নীল আকাশের পানে
বলাকার সারি যখন ফেরে আপন নীড়ে।
তখন মনের গহন কোণে
উঁকি দেয় সেদিনের বসন্ত বিকেল।

আজ ও বসন্ত-
চেনা মানুষের ভিড়ে খুব চেনা দুটো চোখ।
আবারও মুখোমুখি আমরা দুজন।
প্রশ্ন-- হয়তো বা দুজনেরই মনে,
উত্তর হলো না দেওয়া-নেওয়া,
শুধুই নীরবতা!
চেনা মানুষ কে দেখলাম অচেনার আড়ালে।

আজ যখন-
বায়ুদূষণে আকাশ নীলকণ্ঠ,
ধরিত্রী অ্যাসিড বৃষ্টির ভয়ে ভীত।
রামধনু ওঠে না আর প্রজাপতির ডানায়,
বাড়ির উঠোনে খুনসুটি করে না জোড়া শালিক।
সেদিনের জল আজ বরফে পরিণত।
শুধু আমিই রয়ে গেছি ঠিক আগের মতো!!

একটু আলো চাই - বদরুদ্দোজা শেখু



একটু আলো চাই ,একটু আলো চাই

হে সূর্য ,একটু আলো চাই ।


ওই পোড়ো গোয়ালের পিছে

নিম আর নিশিন্দার নীচে

ভয়ের ছায়ারা ভূতের মতোই খেলা করে ।

পাতাঝরা শব্দের হাততালি বেজে উঠে থরে থরে ।


বুড়ো মা'র নিকানো উঠোনে

এঁটো পাত বাসনকোসনে

খুটখাট শব্দ তোলে ইঁদুর না ব্যাঙ ?

আওতার চারিপাশে  ঠেকে শুধু চোর-চোর ঠ্যাং ।


ওই বাঁশবাগানের  পারে

বোষ্টুমীর বিরিঞ্চির ধারে

ছায়া ছায়া হাই তোলে পরীর প্রতিমা ,

বুকে এসে ঢি ঢি করে ডানপিটে ডাইনীর ঢাঢ্ঢার উদোম দ্রাঘিমা ।


ঝুরিময় প্রাণের শিকড়ে

গোঙানির তীব্র শ্বাস পড়ে

হিংস্র হ'য়ে উঠে ঢা-ঢা বাতাসের ঘোষ ,

আদিম গুহায় ফোঁসে ক্ষিপ্ত কোনো প্রলুদ্ধ রাক্ষস ।


আর দ্যাখো :

চারিপাশে শ্বাপদের ফণা কতো ফুঁসছে ,

আমাদের অসহায় দশা  কা'রা শুষছে ,

ভয়ানক ভূপালের রাত চোখে ভাসছে ,

নিঃশ্বাস ফুসফুসে রুদ্ধ হ'য়ে আসছে ;

নিরীহ পৃথিবী আজ দাম্ভিক শক্তির হাতে ক্রীড়নক ,

জীবনের ন্যূনতম অধিকার কেড়ে নেয় রক্ত-শোষক ।


কোন্ দিকে পা বাড়াবো আজ ?

--চারিদিকে নারকী সমাজ ,

কবে এই বিপন্ন বিদিশার অমানিশা টুটবে ?

শান্তির নিরাপদ জীবনের ফুল কবে ফুটবে ?


আমি বড়ো ভালবাসি

শুশনি আর কলমির শাকে-ভরা পুকুরের ঢল ,

হাঁটু জলে শাক-তোলা মুচি-বৌ---কালো রঙ এলো কুন্তল ,

নিমগাছে হলুদ পাখিটি

সবুজ রেখায় দিগন্তে নীলিমার চিঠি ,

আর রোদে-গলা নিঝুম দুপুরে বটতলায়-বসা জয়নালের বাঁশি ।


আজ আমি তাই

দুঃসাহসী মনে এক মহাদেশ খুঁড়ি ---

আলোর মুক্তার খোঁজে আঁধারের সমুদ্রে ডুবুরী ,

চারিপাশ বড়ো ভয়ানক--

এমন জীবন বড়ো বিপজ্জনক ,

বড়ো আর্ত , বড়ো অসহায় ।

একটু আলো চাই ,একটু আলো চাই

হে সূর্য , একটু আলো চাই ।।

লকডাউন - প্রদীপ ঘোষ


ছাদে আমি একা ... একাকী
 আকাশের দিকে তাকিয়ে...
ওই দূরে... এক ফালি চাঁদ,
কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে...
নক্ষত্রগুলি মিটমিট করছে।
একটি তারা এখনও জ্বলজ্বল করছে।
চারিদিক নিঃস্তব্ধ...
যে রাস্তাতে অবিরাম যাতায়াত
তা নিঃশব্দে কিছু বলছে,
ওই দূরে হারিয়ে গেছে একাকী...
পড়ে থাকা পাতায় ভরে গেছে।
পৃথিবী যেন গভীর ধ‍্যানে মগ্ন,
হয়তো বা কোন গভীর অসুখ...
একটি কাল প‍্যাঁচা মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে।

সন্ধ‍্যা বেলা বেটুর মা কবিতাকে বললো-
'কাল থেকে কয়েক দিন আসতে হবে না।'
শুনে মুখখানা করুণ হয়ে গেল।
কয়েকদিন থেকে মালিকের বাড়িতে শুনছিল..
দেশে করোনা নামে এক ভাইরাস এসেছে।
হাঁচি, কাশি, ছোয়াছুয়িতে ছড়িয়ে পড়ছে।
তাই হয়তো...

কবিতা আমাদের বাড়িতে কাজ করে
শহরের এক কোণে বস্তিতে থাকে,
একটি ছয় মাস ও একটি তিন বছরের মেয়ে।
ওর মরদ রিক্সা চালায়।
যা হয় তা মদ খেয়ে জুয়াতে ওড়ায়।
সকালে দেওয়া একখানা রুটি গোগ্রাসে গিলে
আর মুড়ি আঁচলে বেঁধে বাড়ি।

তারপর- অমাবস‍্যা আসে
লকডাউন ২১ দিন...৪১দিন..জারি ১৪৪ধারা।

রেশন দোকানে আর চাল-ডাল নেই,
বাজারে চাল পাওয়া যাচ্ছে না,
পুলিশের চোখ এড়িয়ে দত্তবাবুর গোডাউন থেকে চড়াদামে পাঁচকেজি চাল পেলাম কয়েকদিন পরে হয়তো সেটাও মিলবেনা।
যেন শুনতে পেলাম কবিতা বলছে -
'এক মুঠো চাল দাও বাবু, একমুঠো চাল...'
 আক্রান্তের সংখ‍্যা হু হু করে বাড়ছে,
পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

পূর্ণিমার চাঁদ যেন ক্ষয় রোগে আক্রান্ত!
বাড়িগুলো সব চুপ!
মাঝে মাঝে দূর... থেকে কান্নার আওয়াজ
হৃৎপিন্ডের শিরা উপশিরা গুলোকে
আরো দুর্বল করে দেয়
নিংড়ে নেয় আমার ফুসফুসটা।
রাত্তিরে কুকুরগুলো আর ঘেউ ঘেউ করেনা।
চারিদিক যেন শূন‍্যতায় ভরা,
শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ কানে বাজে।
কবিতার করুণ সুর আর শোনা যায় না
কবিতা আর বলেনা, কবিতারা বলেনা-
'এক মুঠো চাল দাও বাবু, এক মুঠো চাল।' 

নতুন করে বাঁচা যায় - সৌভিক দাস


আমরা দিন দিন কিরকম একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি,
যেখানে আমরা ভেবেছিলাম একমুঠো স্বপ্নের বিশ্বাস আটকে রেখে ভালোবাসা উজাড় করে দেবো,
ঠিক সেখানেই আমরা হোঁচট খেয়ে আমরা ডুবে যায় ভরা সমুদ্রে মাঝখানে,
যেখানে না আছে কোনো পথ বেরিয়ে আসার আর না আছে কোনো ভেসে থাকা উপকরন,
শুধু যেটা বেঁচে থাকে তা আসার আলো।
অনেক নাবিক যারা পার হওয়ার..তারা পার হয়ে যায় গন্তব্য স্থলে,
আর কেউ কেউ বা আটকে থেকে যায় সেই আসার আলো কে খুঁজবে বলে..!
পৃথিবী সুন্দর থাকার সত্বেও মানুষের নিশ্বাস আজও আটকে রেখে দেই সেই কৌল বালিশের বিছানাতেই ,
তবে ...আঁকরে ধরে বাঁচতে চাই মানুষের ভালোলাগার গল্প নিয়ে,
মানুষ ফিরতে চাই না তার মন খারাপের রাত নিয়ে,
যা শুধু চাই দুমুঠো পরন্ত বিকেলের নিষ্ঠার নিয়ম কাছে পেতে।

কিন্তূ কলিযুগের বসন্তের নিয়ম... তারা আজ ভঙ্গের খাতাই নাম লিখিয়েছে জোৎস্নার আলো না কাছে পেতে,
তারা চাই নি জোনাকি পরিবেশ নিজের গায়ে রাখবে বলে,
তারা শুনতে চাই নি মেঘ পিয়ানোর সুরে ভেসে বাঁচবে বলে ,

তাই  কত কত মন আজও রাস্তাই ঘুরে বেড়াই...
কাঁদতে কাঁদতে মন কান্না ভাঙাই..!
হাঁসতে হাঁসতে  মন হাঁসা বারাই..!

.........শেষে নতুন করে বাঁচা যায়।।

                                               

সময় - বেবী পোদ্দার



একটা আর্তনাদের ডাক ভেসে উঠছে বাতাসে
 কথারা হারিয়ে ফেলছে তাদের অস্তিত্ব ।
 এ কেমন বেঁচে থাকা যেখানে মৃত্যুর ভয় প্রতিমুহূর্ত।
 রাস্তার ধারে হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা শাখাপ্রশাখাহীন গাছ ।
 তার থেকে একটা একটা করে সময়ের পাতা খসে পড়ছে ।

গেঞ্জি / সোমনাথ বেনিয়া



- সেই এক‌ই গেঞ্জি! বলছি, এবার এটা ফেলে দাও। চারিদিকে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে এটার কিছু আছে! শরীরের ঘামের সঙ্গে লেপটে গিয়ে ন‍্যাতা হয়ে গেছে।
- হ‍্যাঁ, এই ভাবছিলাম এবার একটা কিনবো‌। আসলে সময় পাচ্ছি না।
- ফের মিথ‍্যা কথা। বাজারের মধ‍্যে থেকে ব‍্যাবসা করছো আর ওই আশেপাশের দোকান থেকে একটা গেঞ্জি কিনে আনতে পারছো না। ঠিক আছে তোমায় যেতে হবে না। সাইজ বলো?
- সাইজ!
- হ‍্যাঁ, সাইজ। আমি কিনে আনছি। কোনো কথা বলবে না।
         তারপর কিছুটা দূরে একটি হোসিয়ারি দোকানে গিয়ে, বলে দেওয়া সাইজের একটি গেঞ্জি কিনে তাকে দিলাম।
- নাও! ওটা খোলো, এটি পরো।
- এখন। না-হয় স্নান করে পরবো খন।
- এমনি এই প্রখর রোদে তেতে পুড়ে ঘেমে-নেয়ে স্নান করেই আছো। গায়েরটি দিয়ে ভালো করে মুছে এটা পরে নাও।
        তিনি তাই করলেন। তার স্মিত হাসির মুখ দেখে মনে প্রশ্ন জাগলো যে কীভাবে রক্ত-মাংসের শরীর নিয়ে এই প্রখর রোদে নির্বিকার ভাবে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকে সংসারে ছাতা হয়ে ...

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২০

কবিতা , উড়োচিঠি - সুপর্না দাঁ

উড়োচিঠি

সুপর্না দাঁ


আজ যাকে নিয়ে চিঠি লিখতে বসা তার নাম মেহগিনি।
আমি যখন ক্লাস সিক্স বাবা তাকে পঞ্চায়েতের বৃক্ষরোপন অনুষ্ঠান থেকে নিয়ে এসেছিল।

প্রিয় মেহগিনি,
        মনে পড়ে আমার কথা ।

বাবা যখন তোকে প্রথম নিয়ে এসেছিল,
 আমাদের বাগানটার মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলিস তুই।

সেদিন বাবার সাথে আমিও হাতে হাত লাগিয়ে ছিলাম ,
রোজ তোকে দুবার দেখে আসতাম,
কথা বলতাম  কত্ত,
প্রথম প্রথম তো কিছুই বলতিস না
বড্ড লাজুক ছিলিস কি না।
তারপর আমাদের মধ্যে জমে উঠেছিল বন্ধুতা
কথার পর কথা যেন, শেষই হতো না।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই, তোকে দেখে আসতাম আর কথা দিয়ে যেতাম বিকেলে কথা হবে,
সারাদিনের ব্যস্ততা টিউশন ,স্কুল আবার টিউশন ছটফট করতাম কখন এসে তোকে পুরো দিনের গল্প শোনাবো,
আর অপেক্ষায় থাকতাম তোর কাছ থেকে
পাশের ডোবায় ফুটে ওঠা শালুক গুলোর কথা, রাজহাঁসের কথা শুনবো বলে...

মনে পড়ে,
ভোরের বেলা প্রথম সূর্যকিরণ যখন ওই শালুক গুলোর উপর পড়তো ,মনে হতো ,যেন ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটি প্রথম আলোর ছোঁয়া পেয়ে স্বাগত জানাচ্ছে ভোরের পৃথিবীটাকে।

আর ডোবায় যে মাছটার নাম রেখেছিলাম ঘ্যাচাং
 সারাদিন সে কটা ফড়িং খেলো?
আজ রাজহাঁস গুলো এসেছিল?
মা রাজহাঁসটার আগের দিন বড্ড শরীর খারাপ ছিল ,আজ ঠিক আছে সে?
কত্ত কত্ত কথা.... কত প্রশ্ন

তুই আদর মাখা সুরে ,তোর ডালপালাগুলো দুলিয়ে কি সুন্দর করে উত্তর দিয়ে দিতিস আমার সমস্ত প্রশ্নের।

মনে পড়ে ,
তোর সেসব কথা
কত নিস্তব্ধ ডাহুক ডাকা দুপুরে
তোর আর আমার কথোপকথন।

তোকে এখন দূর থেকে দেখি
তোর আর আমার মধ্যে এখন একটা কংক্রিটের দেওয়াল,
চাইলেও আর তোর গা ধরে দোল খেতে পারিনা,
তোর গা ঘেঁষে দাঁড়াতে পারি না।

তুই এখন অনেক বড় হয়ে গেছিস
 দেওয়ালের ঘেরাটোপ আটকে রাখতে পারিনি তোকে ,
তুই এখনো শালুক গুলো দেখতে পাস
 দেখতে পাস রাজহাঁস গুলোর আসা-যাওয়া

আমি আর পাই না।।

আমিও এখন বড় হয়ে গেছি
তোর আর আমার বড় হওয়ার মধ্যে তফাৎ শুধু একটাই,
তুই বড় হয়ে দেওয়ালের ঘেরাটোপের বাইরে আর  আমার পার্শ্ববর্তী দেওয়াল গুলো এখন আরো বেশি কংক্রিটময়।

জানিস মেহগিনি,
     আমার বড্ড ইচ্ছে করে
   দেওয়াল  গুলোকে টপকে
মাথার উপর দস্যি মেয়ের খেতাব টা
মুকুট হয়ে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠুক ।

জানিস মেহগিনি,
       অনেকদিন হয়ে গেল
 আমি আমার ছাদের প্রিয় কোনে এসে দাঁড়ায় না,
বহুদিন সূর্যাস্তের লাল আকাশটার দিকে তাকায় না,
ছাদ থেকে যে দূরের পাহাড়টাকে দেখা যায়
তাকে বলা হয় নি ...."ভালো আছো পাহাড়"

আজ এটুকুই থাক

আবার আসবো
  কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে
লাল আকাশটাকে দেখতে,
পাহাড় কে দেখে মিষ্টি একটা হাসি সে বলবো... ভালো আছো?

আবার আসবো
কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে
আমার প্রিয় ছাদটার একটা কোনায় দাঁড়িয়ে তোকে চিঠি লিখতে।

ভালো থাকিস মেহগিনি।।
   
                                         ইতি
                                        তোর ছোট্টবেলার সই

রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০

করোনা যুদ্ধের গল্প - যে পাখি সৈন্য - প্রদ্যোত আশ

যে পাখি সৈন্য

প্রদ্যোত আশ

( উৎসর্গ :-  যারা লড়ছেন , লড়ে চলেন আমাদের জন্য )

১.


- আন্টি ইইইইই
মাস্কের আড়ালে হেসে ওপরের দিকে তাকায় নীলা । ফ্লাটের বেলকনিতে গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ডোডো - আনন্দে বেরকরে ফেলেছে ফোকলা দাঁত । সদ্য তোলা ডালিয়াটা পুজোর সাজি থেকে তুলে দেখায় ডোডোর দিকে । হঠাৎ আতঙ্কিত স্বর ভেসে আসে -ডো , ডোওওওও । মুখ নীচু করে নীলা
- আন্টি কে বাই বলে দাও
প্রায় জোর করেই ডোডোর হাত নাড়িয়ে পেছন দিকে টেনে ঢোকায় বাড়িতে - অবশ্য যাবার সময় ডোডোর মা ও ভদ্রতার হাসি ছুড়ে দেয় । জানা বিষয়েও কেমন অজানা ঠেকে নীলার কাছে । তাড়াতাড়ি আর দুটো ফুল নিয়ে চলে আসে নিজের দরজায়  । ঠাকুর ঘরে এসে বসে - গোপালের ভোগ দিতে বেলা হয়ে যাচ্ছে । মেয়েটাকে বললে হতো - বাচ্ছা মেয়ে কত করবে যদিও থার্ড ইয়ার তবু নীলার কাছে সোনাই আর রিকো কারো বয়েসি বাড়ে না । গোটা ঘরটাই তো কোয়ারেন্টাইন অর্ক ফিরেছে জনতা কার্ফুর দু দিন আগে ভুবনেশ্বর থেকে ফ্লাইটে । একা রিকো থেকে গেছে বেণারসে , আসবো আসবো করতে করতেই লক্ ডাউন । কাজের মেয়েকে ছুটি দিতে হয়েছে ‌ । অর্কর তো হোম কোয়ারেন্টাইন - তাছাড়া ওর বয়সটাও বাড়ছে - আর পাঁচ বছর চাকরি আছে । নীলা নিজেও হাসপাতাল থেকে ফিরে ঠাকুর রাখার ঘরটাতেই নিজেকে বন্দি রাখছে । না মেয়ে - স্বামী - মা কেউ কাউকেই ছুচ্ছে না । মেয়ে যা পারছে রেঁধে দিচ্ছে সবাই কে ওর এটাই ফাইনাল ইয়ার এত সময় এদিকে দেওয়ার পর রেজাল্ট ধরে রাখতে পারবে তো । অর্কর কাছে মেয়ে কে নিয়ে আতু তুতু করলে রেগে যায় - অর্কর একটাই কথা " তখন তো কোন কিছু পারবো না বললেই বলতে - বাব্বা অর্কদা তুমি এখনো মায়ের ছোট ছেলে " এখন বোঝ নিজের ছেলে মেয়ে গুলো কি বড় হচ্ছে না - ও আমার মেয়ে । চ্যাটিং টা একটু কম করবে । " নীলাকে চেঁচালেও অর্ক মেয়েকে আতু তুতু কম করে না ।  ঘড়ি প্রায় পৌনে বারোটা - নাইট করার পর শরীর টানছে না । ছুটি হয়ে গেলেও বসে থাকতে হচ্ছে অ্যাবুলেন্সের জন্য - বাড়ির গাড়ি টা গ্যারেজেই পড়ে - নিজে ড্রাইভটা জানলে ভালো হতো ।  লোকনাথ ব্রহ্মচারির ফটোর সামনে ডালিয়াটা রেখে চুপ করে দাঁড়ায় নীলা - কে জানে কবে সব স্বাভাবিক হবে ! না না এখন আর কাউকেই প্রসাদ দেওয়া চলছে না - ফলত রক্তে চিনি বেশি থাকলেও গোপালের ভোগের থালা থেকে মাখন মিছরি চালান করে নিজের মুখে । একটু পরেই সোনাই দরজায় টোকা দেয় - কাগজের প্লেটে দিয়ে যায় ভুনা খিঁচুড়ি -  মুগের সাথে মুসুরিও মিশিয়েছে ইউটীউব বিদ্যা - সঙ্গে ঝুরো ডিম --- এখন মা , বাপি সবার জন্যই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে , প্রোটিন খেতে হবে - সত্যি মেয়েটা বড় হয়ে গেছে । রিকোর জন্য মন কেমন করে ওঠে নীলার - কি জানি ছেলেটা কি খাচ্ছে , রিসার্চের পেপার তৈরি তো খুব সহজ কাজ নয় - ও কি রান্নাটা ঠিক করতে পারছে ? সোনাই এর সামনে এসব মোটেও বলা যাবে না - " হ্যাঁ দাদাই তো দুগ্ধ পোষ্য , নেক্যু পুষু তোমার বেটার বউ না ওকে বাসন মাজা করাবে ।
যাক আজ আর নাইটে যেতে হবে না - চারদিনের ছুটি । তারপর অবশ্য আইসোলেশনে ডিউটি । বাড়ি আসাও বন্ধ , ওখানেই থাকতে হবে । কত দিন যুদ্ধ চলবে কে জানে অন্য দেশের যা সব ছবি আসছে সোশ্যাল মিডিয়ায় ---- ।  ছুটি পেলেও আবার সেই কোয়ারেন্টাইন । বালিশ থেকেই চোখ খুলে সোজা তাকায় দেওয়ালে লোকনাথের চোখের দিকে । সামনের সুপুরি গাছের মাথায় কি যেন একটা পাখি ডেকে গেল খুব চেনা সুর - সত্যিই এখন কোলকাতা দূষণ হীন - ঝকঝক করছে আকাশ হঠাৎ সকালে বেলার ডোডোর মায়ের মুখটা মনে পড়ে যায় ।
- মা চা
- থ্যাঙ্কু মাম্মা
- ওয়েল কাম ।
ফোনের অ্যালাট টা বেজে ওঠে ,  অন্তরা কে টাকা পাঠাতে হবে , অন্তরা ওর কাজের মাসির মেয়ে - পড়াশোনাই বেশ ভালো ফলত ওর দায়িত্ব একপ্রকার নিয়েই রেখেছে নীলা । মেয়েটা একবারো ফোন করল না ....... খবরটাও নিলো না নীলার , অন্য সময় তো আন্টি আন্টি করে ঢোক গেলে - নাকি স্বাস্থ্যকর্মীদের ফোনে ও কোরনা ছড়াই । অবশ্য জনতা কার্ফু র সন্ধ্যা বেলা ফাটা থালার ছবি পোষ্ট করেছে অন্তরা । রিকোটা আবার তাতে কমেন্ট করেছে " যারা মিছিল করেছে তারা গোয়ালে থাকুক " অন্তরা অবশ্য রিপ্লাই দিয়েছে " মিছিল করিনি জীবানু ধ্বংসের জন্য শব্দ করেছি মাত্র " সোনাই আবার কমেন্ট করেছে " তুই কি জানিস প্রধানমন্ত্রী কেন ঘন্টা , থালা বাজাতে বলেছিলেন ?"  আবার রিপ্লাই " না , আমার দিম্মা বলত শাঁখ বাজালে জীবানু মরে যায় " । নীলা ছেলে মেয়েকে কমেন্ট করা থেকে বিরতকরে । অ্যাপ বেরকরে পে অপসনে লিখে ফেলে ফাইভ জিরো জিরো জিরো , ভাবলো লেখে টাকা তে করোনা নেই - নিজেরই লজ্জা লেগে যায় নিজের কাছে , " মন দিয়ে পড়াশোনাকর " লিখে টাকাটা সেণ্ড করে দেয় ।

২.


ঘর বন্দি থেকে থেকেই ছুটির দিন গুলো পেরিয়ে যায় - একই ঘরে দূরত্ব রাখতে হয় । সবার সাথেই সবার । অর্ক ভাবে , এই সময় বাড়ি না ফিললেই বোধ হয় ভালো হত । ভিডিও কলিং এ সামনে থেকে কথা বলা যেত নীলার সাথে , সোনাই এর সাথেও । নীলার জন্যে গর্ব আতঙ্ক দুটোই কাজ করে । নীলা তখন ট্রেনিং এ - সপ্তাহে একটা চিঠির অপেক্ষাতে থাকতে হতো ওকে । অজানা অশঙ্কা তখন ও হতো --- করোনা নিয়ে দেশ আতঙ্কিত কিন্তু একা করোনাই তো আতঙ্ক নয় - প্রতি নিয়ত জীবানুর সাথে যুদ্ধ করতে হয় - নীলাদের । সোনাই বলছিল ওর বন্ধুর  দিদির এই সদ্য বাচ্ছা হয়েছে দেড় মাস কিন্তু পোষ্ট বেসিকে গেছে বলে ম্যাট লিভ পায়নি ওকেও ডিউটি করতে হবে আইসোলেশনে । বাড়িতে অশান্তি হচ্ছে , সবাই বলছে চাকরি ছেড়ে দিতে , দিদির একটাই কথা ডিউটি তো কর্তব্য , ছাড়বো কি করে ?  ।  হ্যাঁ নীলাও কখনো ডিউটিকে চাকরি ভাবেনি । এখন বয়সের ছাপ পড়ছে শরীরে স্বাস্থ্যই  রক্তের চাপ চিনি দুটোই বেশি । অর্ক ফিরে যায় তিরিশ বছর আগে ..............
- অর্কদা বসবেন ?
তাপুদার বিয়ে , খেতে গেলে যা হয় - খিদে পেলেও জায়গা তো খুঁজতে হবে । ইতস্ততত করে বসেই পড়ে ও । নীলাকে ও আগেই দেখেছে কিন্তু আজ তো অন্যরকম দেখা , খোঁপায় বেলফুলের মালা । তিনজন সখীর পাশে একজন পুরুষ সংঘাতিক রকমের সংখ্যালঘু । না নীলার আবেশ থেকে বেরোতে পারে না ।  খুব কাছের মানুষ তাপু দা , একদিন মনের কথা বলেই ফেলে । তাপুদা বলেছিল " নীলা কারো সয় কারো সয় না " সাবধান , তবে তোর ব্যাপার আলাদা । তাপুদার কাছেই পড়ে নীলা , এই তো আগের বছর একটি ছেলে প্রপোজ করে বসল নীলাকে ব্যাস টিউশেন আসা বন্ধ , ক্লাসে স্টেণ্ড করা মেয়েটির জন্য মাসে তিরিশটাকা লস্ মেনে নিতে হল । অর্ক এখনো নীলাকে বলে তাপুদাকে তোমার দুবছরের লস হওয়া সাতশো কুড়ি টাকা দেওয়া উচিত ।
সোনাই চা দিয়ে যায় । আজকেই অর্কর  কোয়ারেন্টাইন শেষ হচ্ছে । মেয়েটাকে আর একা খাটতে হবে না ।  নীলা রেডি হয়ে বেরোচ্ছে আজ থেকে আইসোলেশনে ডিউটি শুরু ।  অ্যাবুলেন্স আসছে , ফোন করে ছিল । নীলাকে ছুঁতে গেলে সাবানে ধুতে হবে হাত । বুড়ো শিব থেকে বড়কালী যাওয়ার পথটাতে সাইকেল নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম ওর বাঁ হাত রেখেছিল নীলার হ্যাণ্ডেলে রাখা ডান হাতে - পৃথিবী কি এতটা কোমল , না সে দিন আর কিছুতেই ও হাত ছোঁয়াই নি । আজ তবু হাতধুতে হবে । নীলা কি  এভাবেই ভাবছে সব । নাকি যুদ্ধ গেলে যুদ্ধটাই সব । ও যখন নিজে সাংখ্য দর্শন পড়ায় , তখন কোন ছাত্র কি বিশ্বাস করবে ও কালীর উপোষ করে ।

৩.


দরজা খুলে বেরিয়ে আসে নীলা । অ্যাবুলেন্সটা এল বলে পারমিতা দি ফোন করেছিল ওর বাড়িতে সবাই কান্না কাটি করছে । পারমিতাদির পর সবিতাদিকে তুলবে তারপর স্বাগতার বাড়ি হয়ে নীলাকে নিতে আসবে । যাক অর্কর কোয়ারেন্টাইনের মেয়াদ শেষ । বাবা মেয়ে খুব খারাপ থাকবে না । রাস্তার ওপরে দুটো শালিক বসে আছে । যাহ এদের তো কোলকাতায় দেখাই যায় না - পশু পাখি সত্যি আজাদ । টিভিতে দেখাচ্ছিল দীঘার সৈকতজুড়ে কচ্ছপের ডিম । হোয়াটস্যাপে  অ্যাবুলেন্সের লোকেশন আপডেট দেওয়া আছে -  ওই তো জোড়া ব্রীজের কাছে চলেই এসেছে গাড়িটা । অর্ক আর সোনাই দাঁড়িয়ে রয়েছে ।
- আন্টিই ই ই
নীলার চোখ চলে যায় ডোডোদের ব্যালকনিতে । দাদুর কোলে বসে ডোডো ইংরাজী ভি দেখাচ্ছে তারপরেই ফ্লাইং কিস্ । ডোডোর মা ও দাঁড়িয়ে আছে ওর ও অনামিকা আর কনিষ্ঠা বৃদ্ধাঙ্গুলী চাপা , তর্জনি আর মধ্যমার ফাঁক থেকে উড়ে যাচ্ছে  রঙিন পাখিরা  নীলসাদা আকাশের বুকে সত্যি ই আজ আর দূষণ নেই কোলকাতায় ।

শুনে দেখতে পারেনhttps://youtu.be/x3O4DaEOjXA

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২০

করোনা আটকাতে জলে ভরসা

কয়েক দিন ধরে সোশাল মিডিয়া নানান ধরণের ওয়েব পোর্টালে উঠে আসছে করোনা ভাইরাস মোকাবিলার জন্য হরেক টোটকা । কেউ বলছে মদ্যপান করো , কোথাও আবার গোমূত্র পানের পার্টিও হচ্ছে , সব খবরই সোশ্যাল মিডিয়াতে। তবে এই তালিকাতে নব সংযোজন হল পানীয় জল । সারা দিন অল্প অল্প করে জল খেতে হবে যাতে গলা শুকনো না হয় । ফলে ভাইরাস আপনার মুখে ডুকলছ যাতে করে টুক করে পাকস্থলিতে চলে যায় সেখানে অ্যাসিড মৃত্যু ঘটবে করোনার । এই রকম নানান ধরণের টোটকাতে ভরে যাচ্ছে প্রত্যেকের ইনবক্স । শুধু এটুকু বলার কোন রকম শারিরিক সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন । ইউটিউবার দের পরামর্শ বা অতিবিজ্ঞদের কাছে পরামর্শ নিতে যাবে না । সকলে সুস্থ থাকুন এবং ভিত্তিহীন খবর ফোরায়ার্ড করবেন না । তবে হ্যাঁ জল খান থুড়ি পান করুন ওটা এমনিই আমাদের দরকার ।

শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২০

করোনার জেরে বসন্ত উৎসবকে না বলল বিশ্বভারতী


 কয়েক দিন ধরে টালবাহানা চলছিল - আজ সন্ধ্যায় পরিস্কার হয়ে গেল চিত্রটা । টিনে ঢাকা শান্তিনিকেতন নিয়ে উষ্মা প্রকাশকরছিলেন অনেকেই - তবে এবছর স্থগিত ই হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সাধের বসন্ত উৎসব - আপামর বাঙালির আবেগের শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব ।  করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে চিঠি পাঠায় ইউ জি সি তার জেরে আজ বৈঠকে বসে বিশ্বভারতীর কর্মসমিতি - বৈঠক শেষে উঠে আসে অনুষ্ঠাণ বাতিলের সিদ্ধান্ত । স্বভাবতই মন খারাপ এতদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে সেই সমস্ত আশ্রমিকদের - মন খারাপ উৎসব প্রিয় ভ্রমণ প্রিয় বাঙালীর ।
নোটিসের ছবি ফেবু থেকে সংগৃহিত

রবীন্দ্রভারতী থেকে বিশ্বভারতী বসন্ত কি শুধু বিতর্ক !



অবশেষে ধরা পড়ল অভিযুক্তরা - বাহ্ আনন্দ । সত্যিই কি আনন্দের সময় হ্যাঁ রবীন্দ্র ভারতীতে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা পূর্ণ পিঠলেখা নিয়ে যারা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তারা ধরাপড়েছেন - অবশ্যই সাধুবাদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কে । পাশাপাশি যে প্রশ্ন টা রয়েগেল নেটিজনদের মনে তা " এতে কি বাঙালির রুচি সঠিক দিশা পাবে ?" । পাশাপাশি আজ অনেকেই বসন্ত উৎসবের সেই সমস্ত ছবি নিজেদের ওয়ালে পোষ্ট করছেন যা রঙ দিয়ে ঢাকতে হয় না ।

এখন বাঙালি তাকিয়ে শান্তিনিকেতনের দিকে - সেখানে আবার শুরু হয়েছে টিন দিয়ে আশ্রম ঢেকে রাখার অদ্ভুত প্রচেষ্টা তা নিয়েও কেউ কেউ বলছেন " খোল টিন খোল / লাগলো যে দোল " । সব মিলিয়ে রঙের দিনে রঙিন হওয়ার বদলে রঙ জলে নাকানি চোবানি খাচ্ছে বাঙলার কৃষ্টি সংস্কৃতি.................
টিনে ঢাকা ছাতিমতলা

বেশিবার পড়া