পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ৮ মে, ২০২০

সম্পাদকীয় কথা


লকডাউনের মধ্যে আজকের দিনটাও পড়ল । আমরা নিজেদের গৃহবন্দি রেখে আসর সাজালাম । অমলের মতো বাইরের কল্পনাটুকুতেই আনন্দ । পঞ্চক আবারো গান গেয়ে উঠবে পঞ্চমে । বিশ্বাস করছি নীলকন্ঠপাখিরা যখন গাছে গাছে ঘুরছে অসুখ তখন সারবে । রাজা বেরিয়ে আসবে জাল ছিঁড়ে । এই কঠিন সময়ের দীক্ষাতে বলাই এর গাছমন আমরা ছিঁড়ব না । এই অসময়ে প্রকাশিত হল আমার বাংলা পত্রিকার ২৫ শে বৈশাখ ১৪২৭ সংখ্যা ।


নীচের লিংকে গিয়ে সহজে পাবেন এই সংখ্যা
২৫ শে বৈশাখ ১৪২৭

ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথ এবং কোভিড ১৯ ও তার অনুগামী সংকটের মোকাবিলায় তাঁর প্রাসঙ্গিকতা .............হরিসাধন চন্দ্র



    উপনিষদের প্রত্যয় ছোটবেলা থেকেই তাঁর 'বাবামশায়'-এর সচেতন শিক্ষা ও সাহচর্য এবং ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অন্তরজগতে প্রবেশ করে তারপর নিজের নানা অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাওয়া উপলব্ধির ফলে এমন এক বৃহত্-মহত্ স্থান অধিকার করে নিয়েছিল যে, সেটাই তাঁর চিন্তন ও যাপনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল । তাঁর অগণিত রচনার মধ্যে তার প্রতিফলন  পাওয়া যায়। এখন দেখা যাক বিশ্বব্যাপী কোভিড ১৯ ও তার অনুগামী সংকটগুলির মোকাবিলায় তা কতটা প্রাসঙ্গিক । 
     উপনিষদের মূল বার্তা হল, সবকিছু মিলিয়ে বিরাজ করছেন এক সচেতন অখণ্ডতা অর্থাত্ ব্রহ্ম। এর মধ্যে ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান --- 'সত্যম্' অর্থাত্ চিরন্তন ও অবিসংবাদিত, 'শিবম্' অর্থাত্ মঙ্গল  এবং 'সুন্দরম্' অর্থাত্ আনন্দদায়ক আর তাই প্রেমজাগরূক । ব্রহ্ম নিজেকে প্রকৃতি রূপে প্রকাশ করলে এই বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকট হয় ।  তখন তাকেই বলা হয় সগুণ ব্রহ্ম । এই বিশ্বব্যাপী প্রকাশ তাঁর ঐশ্বর্য, আর ঐশ্বর্য আছে বলেই তিনি 'ঈশ্বর'। আর প্রকাশিত রূপের অন্তরালে যে অরূপ সত্তা  থাকে তা হল নির্গুণ ব্রহ্ম । স্বরূপত উভয়েই এক । ব্রহ্মের এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কোনোভাবে ব্যাঘাত ঘটলেও আবার নিজের স্বরূপে ফিরে আসাটাই এর চরম পরিণতি। এই প্রতীতি ধ্বনিত হয়েছে তাঁর সিংহভাগ লেখাতেই, আর যেখানে তা হয়নি সেখানেও কিন্তু এই প্রতীতির বিরুদ্ধ কোনো ভাবের প্রকাশ ঘটেনি । তাঁর ওই ঔপনিষদিক দর্শনের বাহক কয়েকটি গানের অংশ উদ্ধৃত করা গেল : 
১) 'সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে ।'
 ২)তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি যাই 
কোথাও দুঃখ কোথাও মৃত্যু  কোথা বিচ্ছেদ  নাই
- - - - -------------- ----- ------  ------- ------- ---- ---- ----- --     ------
হে পূর্ণ তব চরণের কাছে 
 যাহা কিছু সব আছে আছে আছে 
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই 
নিশিদিন কাঁদি তাই।
৩)  বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিরাজ      
 সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও ।
৪)আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া 
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া । 
৫)রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি । 
                                      ( গীতবিতান )
 এই সচেতন অখণ্ডতাকে নিজের অন্তরে প্রত্যক্ষভাবে  উপলব্ধি করতে পারলে তখন সারা বিশ্বের সমস্ত কিছু  মিলেই তো 'আমি' ----এই উপলব্ধি হয়।অর্থাত্ তখন রক্ত-মাংসের দেহটার মধ্যে সীমাবদ্ধ 'আমি'টা বাড়তে বাড়তে অসীম হয়ে ওঠে ।এটাই রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় বড়ো 'আমি'। তখন আর ঈশ্বর অর্থাত্ উপাস্য আর ভক্ত অর্থাত্ উপাসকের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না, অর্থাত্ উভয়ের আর দুটি পৃথক সত্তা থাকে না। তখন দ্বৈত পর্ব শেষ হয়ে অদ্বৈত সত্তায় পৌঁছে যায় উপাসক । তখন উপাসকের উপলব্ধি  : '  বিভিন্ন উপনিষদের নির্যাসের সুসংহত রূপ বেদান্ত দর্শনে এই অদ্বৈতবাদেরই সুবিস্তৃত ও যুক্তিনিষ্ঠ রূপটি পাওয়া যায় । কিন্তু এই বড়ো আমির পর্যায়ে পৌঁছানো তো সহজ নয়। অজ্ঞানতার বশে অহং বোধ ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তার বেড়া দিয়ে আমাদের আটকে রেখে দেয়, বড়ো হয়ে উঠতে দেয় না । সেই  বেড়া ভেঙে বিশ্বসত্তার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আর্তি নিয়েই ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করে, প্রার্থনা জানায়, যাতে তিনি উপাসককে নিজের মধ্যে গ্রহণ করে নেন। এতেই চলে ভক্ত ও ভগবানের লীলা। এতে কত মান-অভিমান, আশা-হতাশা, আনন্দ-বিষাদ । এই লীলা আস্বাদনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই ব্রহ্ম একমদ্বিতীয়ম্ হওয়া সত্ত্বেও বহু ও বিচিত্র রূপে প্রকাশ করেন। কিন্তু সেই সব রূপ মিলেই তাঁর প্রকট সত্তা । এই অদ্বৈতবাদের উপলব্ধি পুরোপুরিভাবে যাঁর মনে জাগবে, তিনি কাউকে ভয় পাবেন না, কাউকে শত্রুজ্ঞানে আঘাত করবেন না। কারণ সবকিছু তো তাঁরই রূপভেদ মাত্র । তিনি কাউকে শত্রু মনে করবেন না। যদি তাঁর সান্নিধ্যে বা গোচরে এমন কোনো ব্যক্তি থাকে, যার উচ্চারণ-আচরণ  অসঙ্গত  , তাহলে তার শোধনের জন্য যেটুকু আঘাত দরকার, সেটুকুই কেবলমাত্র তিনি করবেন,কিন্তু অন্তরে থাকবে ভালবাসা। 'রক্তকরবী'র রাজা অগণিত মানুষকে শোষণ করে শক্তির অধিকারী হয়েছিল বলে রঞ্জনের নেপথ্য অনুপ্রেরণায় নন্দিনী রাজার প্রতিস্পর্ধী চরিত্র হয়ে রাজ্যে বিপ্লবের ঝড় এনে তোলপাড় ঘটিয়ে দিয়েছে, কিন্তু পরিণতিতে রাজাকেও  তাতে সামিল করেছে । এই দৃষ্টান্ত ভারতের বাইরে থাকলেও তা বিরল। আর উপনিষদের যে ভয়হীনতার বলিষ্ঠ প্রেরণা আছে 'অভী' বাণীর মধ্যে, তারই জয়গান করেছেন রবীন্দ্রনাথ নানা স্থলে । ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা  : 'ভয় হতে তবে অভয় মাঝে নূতন জনম দাও হে।' আবার এক জায়গায়  :
          'এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়, 
          দূর করে দাও তুমি সরব তুচ্ছ ভয়--
          লোকভয়,রাজভয়,মাত্রায় আর।'
                                                          (নৈবেদ্য)
এই সমস্ত ঔপনিষদিক প্রতীতির বাণীরূপ তাঁর 'শান্তিনিকেতন' গ্রন্থে প্রতিটি নিবন্ধেই সুলভ।  
      এবার আসা যাক সারা বিশ্বকে উত্কণ্ঠিত করে তোলা নোভেল করোনা আর তার আনুষঙ্গিক সংকটাবলীর মোকাবিলায় ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতার মূল্যায়নে ।  
     আজ  বিশ্বের সকলকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস, সমন্বয় এবং যুক্তিনিষ্ঠ ও বাস্তব প্রয়োগের উপযোগী কর্মসূচি নিয়ে এগোতে হবে ।কিন্তু কোথায় তা? আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তো দূরের কথা ,আমাদের জাতীয় পটভূমিতেও তার অভাব মাঝে মধ্যেই বড়ো নগ্ন হয়ে ফুটে উঠছে ,যা সমস্যার সমাধানের সামনে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিজের ত্রুটি স্বীকার না করে তাকে ঢাকা দেওয়ার অপচেষ্টা, নিজের জয়গান নিজেই প্রচার করা, প্রতিপক্ষের কোনো ভালো কিছুকে স্বীকৃতি না দিয়ে বরং তার ছিদ্রান্বেষণ এসবের ফলে ঐক্যবোধ, বিশ্বাস, সমন্বয়, বাস্তপোযোগী কর্মসূচি গ্রহণ-- সবই ব্যাহত হচ্ছে । বিশ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে পরস্পরের প্রতি ।অথচ এই মহাসংকটে সেটা অপরিহার্য । তাই 'মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ'(সভ্যতার সংকট) --- এই  রবীন্দ্রভাষ প্রতি মুহূর্তে মননে জাগরূক রাখতে পারার উপযোগিতা এখন বিরাট । আর যতই প্রচার করা হোক ভয় না পাওয়ার প্রেরণা জোগাতে, ভয় তো জাগছেই। এই ভয় নিরসনে তো 'অভী'র মহাভাষ্যকার রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে বড়ো আশ্রয় । তাই আজ রবীন্দ্রনাথের জন্মপক্ষের সূচনালগ্নে আশা রাখছি, ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় শুরু হতে পারে সমাধান প্রয়াসের  নতুন  অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথেরই সমকালীন ও প্রায় সমবয়সী বিবেকানন্দও এই প্রত্যয়ে দৃঢ় ছিলেন যে, অদ্বৈতবাদই পারে বিশ্বমৈত্রীর প্রতিষ্ঠা করতে । আর এটাও বলেছিলেন, 'এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ ' (বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা )। তাই ভারতই আজ পথ দেখানো শুরু করুক না! আর এক পা এগিয়ে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে, যে দেশের জাতীয় সংগীত( National Song) ও জাতীয় স্তোত্র (National Anthem ) বঙ্গসন্তানের রচনা, সে দেশের এই মহাভিযানে মহামতি গোখলের এই বাণীর বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রেও সম্ভব  :  'What Bengal thinks today.......'
         তবে দুঃখের বিষয়,  কী ব্যক্তি কী গোষ্ঠী, বেশির ভাগের মধ্যেই দেখা যায় নিজের কোনো মতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ,সোজা কথায় বিপক্ষকে হারিয়ে জেতার জন্য কোনো বহুজনস্বীকৃত মানুষের সামগ্রিক জীবনদর্শন বা যাপনধারার একটা অংশ নিজের প্রয়োজন মতো তথাকথিত যুক্তির ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে  কেটে নিয়ে সেই রক্তাক্ত খণ্ডটিকে আলোচনার থালায় সবার সামনে পরিবেশন করে শ্লাঘা অনুভব করার প্রবণতা । রবীন্দ্রনাথও সেই নির্মমতা থেকে রেহাই পাননি । রবীন্দ্রবীক্ষণের এই ঔপনিষদিক দিকটিকে কার্যত অস্বীকার করে বা অপব্যাখ্যা করে মানবতাবাদী হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা অনেকেই করে । একজন বড়ো মাপের মানবতাবাদী তো তিনি অবশ্যই ছিলেন,  কিন্তু আজীবন তাঁর মানবতাবোধের জয়গান ছিল ঔপনিষদিক বোধির স্বরগ্রামে বাঁধা । আর এই ঔপনিষদিক অধ্যাত্মবাদকে ভাববাদী ধারণা বলে অনেকেই উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।কিন্তু মনে রাখা উচিত, 'বিজ্ঞান' শব্দটি উপনিষদেই উচ্চারিত হয়েছে প্রথম । আর সেক্ষেত্রে এটি কোনো আচারপ্রধান ধর্মের অঙ্গ নয়, বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার উত্সার। তার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের স্বরূপত কোনো বিরোধ নেই ।আর রবীন্দ্রনাথের ঔপনিষদিক সত্তাও বিজ্ঞানচর্চার বিরোধী তো ছিলেনই না, বরং অত্যুত্সাহী ছিলেন এব্যাপারে, এমনকি বিজ্ঞানবিষয়ক বইও লিখেছেন একাধিক । নিজের পুত্রের একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার ব্যবস্থাও করেছেন, বিশ্বভারতীতে বিজ্ঞান শিক্ষার সুপরিকল্পিত ভিত্তি  স্থাপন করেছেন । তাই তাঁর  ঔপনিষদিক সত্যকে অস্বীকার বা অবহেলা করার অর্থ শুধু রবীন্দ্রনাথের অবমাননাই নয়,  আমাদের এই মহাসংকটের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের জন্য মহামূল্যবান একটি অস্ত্রের শোচনীয় অবহেলা ।  তাই এই রবীন্দ্রপক্ষে বিশ্বের সামনে অদ্বৈতবাদে অভিস্নাত রবীন্দ্রদর্শনকে তুলে ধরার দায়িত্ব নিক ভারতবর্ষ বিশেষত বঙ্গভূমি

" ঠাকুর যেমন " ............. স্বপন বিশ্বাস


          আমার চোখে রবীন্দ্রনাথ " -- বিষয়টি মূলত স্মৃতি নির্ভর  , আর স্মৃতি হ'ল স্বভাব দূর্বল। তাই একটু সন্ধান করে করে তাদের সংগ্রহ করে সময় সারনী অনুসারে সাজিয়ে নিতে হবে।
       বাল্যে লক্ষ্মী, গণেশ, হনুমান সহ অনেক ঠাকুরের সাথে প্রায় একাসনে বিরাজমান ছিলেন রবীন্দ্রনাথ -- প্রসাদ ও কাঁসর-ঘন্টা ছাড়াই ফুল মালা চন্দন চর্চিত "ঠাকুরের" ছবিতে ধূপ দেখানো হোতো নিয়ম মেনে। আর বিশেষ পূজার দিন ২৫শে বৈশাখ -- সেদিন স্কুল-কলেজ থেকে পাড়ার মঞ্চ মুখরিত হোতো গীত-বাদ্যে-আচারে ; সেদিন হৃদয় থেকে উৎসারিত হোতো রবীন্দ্র-মন্ত্র -- "২৫শে বৈশাখ  হে নূতন .... "; আর রবিঠাকুরের পূজায় আমার সবথেকে ভালোলাগার দিকটি ছিল উপবাসহীনতা।

          আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন পাঠ্যের বাধকতা -- ভালোলাগার বাঁধন তখনও পর্যন্ত শেকড় ছড়ায়নি ; তুলনামূলকভাবে শরৎচন্দ্র, বিশেষ করে ' শ্রীকান্ত ' গোগ্রাসে গিলছি। ১৬-১৭ বছর বয়স অবধি গদ্য সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, ডায়েল সাহেব, শিবরাম, সত্যজিৎ, সুনীল ইত্যাদির কাছে রবীন্দ্রনাথ গোহারা হারছেন, এমনকি সহজলভ্য স্বপন কুমারও কম যান না। যদিও অনেক পরে জেনেছিলাম যে ঋষি রবীন্দ্রনাথ উচ্চ-কোটির কবি সাহিত্যিকদের জন্য লেখেন এবং আরও পরে অনুভব করলাম উপনিষদ না পড়ে রবীন্দ্র পাঠেও সমান পূণ্য।

          যাইহোক, পরিবর্তনশীল জগতে সময়ের সাথে সাথে আমরা নিজেদের মতো করে পাল্টে নি শাশ্বত রবীন্দ্রনাথকে। এদিকে ১৮ -- ১৯ বছর বয়সে শুনলাম রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি এবং সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার এক জমিদার পুত্রের সাধের বিলাস হ'ল তাঁর সাহিত্য রচনা। কিন্তু তবুও  পরিক্ষার খাতা থেকে জলসা সর্বত্রই 'ঠাকুরের' দেবতুল্য  দৃপ্ত আনাগোনা তখনও অবিরাম। এমনকি সামঞ্জস্যপূর্ণ কোটেশন মনে না পড়লে সদ্য শোনা  কোনও গানের দু এক লাইন ইনর্ভাটেড কমার মধ্যে ঢুকিয়ে রবীন্দ্রনাথের বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও সেই সময়ের উত্তরপত্রগুলিতে পাওয়া যেত, যেমন --
" তাইতো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন --
      'যা চেয়েছি আমি তা পাই না
        যা পেয়েছি কেন তা চাই না ....'  "
পরে সেই উত্তরপত্রের মালিকের সাথে পূর্ব করপোরাল পানিশমেন্ট যুগে বাংলা ক্লাসে কী ঘটতো তা বুঝতে পারার জন্য কোনো পুরস্কার নেই।

       তা এই আপেক্ষিকবাদের পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ বদলে যেতে থাকেন সময় থেকে সময়ে, বয়সের ধাপে ধাপে । আমি যে আপোষহীন ছাত্রনেতাকে নিষিদ্ধ কর্মে রত হতে দেখেছি , অভিসারের লক্ষ্যে  তাকেই হারমোনিয়ামে প্রাণপণে তুলতে দেখেছি -- " ন্যায় অন্যায় জানিনে জানিনে জানিনে ... " । তখনই বুঝেছি রবি কবির দ্বার সবার জন্যই অবারিত -- আশ্রয় প্রশ্রয়ের বাছবিচার সেখানে নেই ; তাঁকেই সবার দরকার -- তাই গোপনে বা সোচ্চারে অবাধ প্রবেশ তাঁর দরবারে।

            উৎকৃষ্ট সাহিত্য হোক বা ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী -- গীতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, তাই কালজয়ী। ঠিক তেমনিই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে রবীন্দ্র রচনা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সঙ্গীত, কাব্য, সাহিত্য, কলার পুরুষ সরস্বতী হলেন রবীন্দ্রনাথ। বিষয় ভাবনার ব্যপ্তি ও বৈচিত্র্যে তিনি অসজ্ঞাত  -- যেকোন ভাবনার রঙের যেকোন শেড্ তাঁর কাজের কোলাজে ঠিক খুজে পাওয়া যাবে  -- যার যেমন প্রয়োজন খুজে নিতে পারে তাঁর সম্ভার থেকে।

          '  জল পড়ে পাতা নড়ে ' থেকে শুরু করে সীমানা ছাড়িয়ে অসীমে তাঁর বিচরণ -- যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানের স্থান কাল পাত্র অনুযায়ী ও নিজের চিন্তন অনুসারে তিনি বিমোচিত হন  , আবার সময়ের পথ ধরে এগিয়ে গেলে ফেলে আসা সময়-বিন্দুর রঙ রস গন্ধ অন্য রূপে ধরা দেয়। অনেকেই আবার সেখান থেকেই আগামীর সন্ধান পায়।

           ভাবনার ব্যবহারিক প্রয়োগে ও যাপনে তিনি ছড়িয়ে আছেন, জড়িয়ে আছেন  --  সমঝদার, ভক্ত, রসিক, সমালোচক ও শিল্প-কীটেরা ঠিক তাঁকে খুজেঁ পেতে নিয়ে মধু খায়, মাতাল হয়, গান গায়, রসদ জমায় ও সমৃদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথ হলেন বহতি গঙ্গা  --- ডুবকি লাগাও আর সত্য-শিব-সুন্দর পাও। 

আমার ছেলেবেলা আর আমার রবীন্দ্রনাথ ......... প্রদ্যোত আশ



জানি আমি কোন কেউ কেটা নই তবে কি নিছকই অপাংতেয় -  তা হয়ত নয় - তাহলে এই যে তুমি পড়ছ -  এটা পড়তে না । সে যাই হোক আমারো ছেলেবেলা জুড়ে আছে অনেক কিছুই তাঁর মধ্যে আছে রবীন্দ্রনাথ । কবে কোন বয়স থেকে রবীন্দ্রনাথ মনের ভেতর রয়েছে বলতে পারবো না -  এই না পারাটার পেছনে একমাত্র দায়ি আমার বাবা মা - বাবা একটু বেশিই । তখন বাবা ঘরের থাকার সময়টা আকাশবাণী খুলে রাখনতেন -  কলকাতা ক প্রচার তরঙ্গ আর সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন তাঁর একমাত্র আড্ডার জায়গা রবিতীর্থ ( তুলিন রুরাল লাইব্রেরী ) । আমার গল্পের বই পড়াটা শুরু ওই রিডিং পড়া শুরু থেকেই । আর কখন যে শিব ঠাকুর কালি ঠাকুর দের মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও একজন ঠাকুর পরিবারের সদস্য হয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন -  আমি জানি না -  আমি জানতাম সীতাকে গণ্ডীর মধ্যে রেখেছিলেন লক্ষণ আর রবীন্দ্র নাথ কে ঘরের চাকর আমার কাছে তখন দুটো গণ্ডী ই সমার্থক তাই মা ঘর থেকে বেরোতে বারণ করলে কঠা ঘরের জানালার রড ধরে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম বনডি পাহাড়ের মাথার দিকে -  মা বলত বাঘ আছে - আমি ভাবতাম অমল ও দইওয়ালার কথা । মনে আছে ক্লাস টু তে অভিনয় করার কথাছিল রিহার্সাল করেছি অমলের ভূমিকাই শেষ পর্যন্ত দইওয়ালার শরীর খারাপ হওয়াতে নাটক টা করা হয়নি -  মজার ব্যাপার হল আমার মা তাতে খুশি হয়েছিলেন -  আসলে আমার বাবা মাকে ডাকঘরের গল্পটা বলেছিলেন -  বলেছিলেন শেষে অমল মারা যাবে -  কোলের ছেলেকে ওই চরিত্রে মা মানতে পারেনি ।
আমার বাবা একা একভাই আর দাদা অনেকটা ছোটথেকেই মামা ঘরে -  তবু বাখুল ঘরে তোতো ভাই বোন দের অভাব ছিলনা , এই নিয়ে একটা হই হই ব্যাপার ছিল । আমি চালচুয়ানি - কুমিরডাঙ্গা যেমন খেলেছি রামায়ণের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেছি সিন্দুয়াঁ ডালের ধনুক নিয়ে -  ব্যাট বল খেলেছি অনেক সময় বাঁশের ডাঙ্গের ব্যাট আমড়ার বল আর বালতিকে উইকেট করেই । আর এই এত কিছুর সঙ্গে ছিল আমার উদ্যোগে ঘরে ২৩ শে জানুয়ারী আর ২৫ শে বৈশাখের পূজো -  ভোগের ব্যবস্থা মা করতেন বাকিটা আমরা । খাতার পাটাতে বিয়ে ঘরের কার্ডের রঙিন কাগজ চিটিয়ে তাতে তরুণ মামার দোকান ( সোনামুখী) থেকে আনা ২৫ পয়সার রবীন্দ্রনাথের ছবি চিটিয়ে মালা পরিয়ে ২৫শে বৈশাখ ।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রত্নদীপ ভদ্র


তোমার প্রিয় কবি 'রবীন্দ্রনাথ', এই রচনা মুখস্থ করতে বসে চতুর্থ শ্রেণীতে প্রথম পরিচয়। 'কবি' তে 'ই'কার, 'রবি' যে 'ই'কার, যেই হলো 'রবীন্দ্রনাথ' ওমনি দুম করে 'ঈ'?
বাবাকে বললাম 'ভুল লিখেছেন', বাবা বোঝালেন কি সব সন্ধি না ছাই! তখনকার মতো সন্ধিস্থাপন হলেও মনঃপূত হলো না।
বাবা ছবি দেখিয়ে চেনালেন। ' মা গো! কি বিচ্ছিরি। একগাল দাড়ি, ঠিক 'মহাভারতের' ভীষ্মের মতো।' নিজের মতো করে বুঝলাম অনেক বুড়োবয়সে কবি হয়েছেন বোধহয়।
সেই থেকেই এই লোকটিকে আমি ঠিক পছন্দ করি না।

 স্কুলের উঁচু ক্লাসে আবার অন্য বিপদ!  আমি বুঝলাম একরাজা আর ভিখারির গল্প নিয়ে লেখা কবিতা, বড্ড সাদামাটা, স্যার বলেন না, খুব জটিল, পরোমব্রহ্ম কে নিজেকে উৎসর্গ না কি সব।পড়ে বুঝি এক, স্যার বোঝান আরেক। আচ্ছা মুশকিল! পড়তে তো ভালোই লাগে কিন্তু কি যেন বোঝা বাকি থেকে যায়।
প্রতি বছর স্কুলে আমি 25শে বৈশাখ কবিতা আবৃত্তি করে প্রশংসা পাই। কবিতা মুখস্থ করে বলতে হবে তাই বার বার পড়ি, ' বীরপুরুষ' , 'আফ্রিকা', ভালো লাগে পড়তে কিন্তু ঠিক ধরতে পারিনা। ধুর ছাই। বাদ থাক, আমার আরও ঢের কাজ থাকে।

কলেজে বাবা আমি ইংরেজি অনার্স! এলিট ক্লাস। জন ডান, মিল্টন ইংরাজীর তুবড়ি।প্রিয় বন্ধুরা অনেকেই অন্য ডিপার্টমেন্ট।ওরা কি সব বাংলা না কি যেন পড়ে।

 ক্যান্টিনের আড্ডাতে তুমুল ঝড় তনুশ্রী, মৌসুমী, সব্যসাচী দের সাথে, ওই রবীন্দ্রনাথ নাকি ' কালজয়ী', যতসব। আরে বাবা 'গীতাঞ্জলি'টা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছিল বলেই না পেলো। নাহলে ধরে কাছে থাকতো শেক্সপিয়ার, কিটস, শেলীর? যতসব আদিখ্যেতা!

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এলো প্রেম। চিঠিতে ছত্রে ছত্রে প্রেমিকা কোট করে সেই রবীন্দ্রনাথ। বড্ড ঝামেলা। জবাব দিয়ে ঝাড়লাম মিল্টন, ব্যস, আর কি , ফুস! রাগ টা গিয়ে পড়লো ওই রবীন্দ্রনাথের ওপর। আমারই দোষ কেও রবীন্দ্রনাথ পড়া মেয়ের সাথে প্রেম করে?

কলেজের পর অখণ্ড অবসর, বেকার তো। ওই সারাদিন বাড়ির লোককে দেখিয়ে পড়াশোনা আর বিভিন্ন লেখকের বই। বেছে পড়িনা, যা পাই। বাড়িতে অনেক বই, না না আমার নয়, মা বাবা দুজনেই যে বাংলার শিক্ষক। শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, দ্বিজেন্দ্রলাল, মাইকেল, শংকর, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সত্যজিৎ বাদ যায় না কিছুই। শেষে তাক ঝেড়ে, বাধ্য হয়ে বারকরলাম,  'গোরা', ' বউ ঠাকুরানীর হাট' 'রাজর্ষি', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', ' ছুটি', 'ক্ষুধিত পাষাণ', আরো কত। দুচোখে বিস্ময় একজনের পক্ষে এক জীবনে পড়ে শেষ করা যায় না তুমি এতই বিস্তৃত! বুঝলাম কিছুই বুঝিনি এতকাল।

"মানুষের মধ্যে দ্বিজত্ব আছে;
মানুষ একবার জন্মায় গর্ভের মধ্যে,
আবার জন্মায় মুক্ত পৃথিবীতে।
মানুষের এক জন্ম আপনাকে নিয়ে,..." 

সিংহাসন ...........কৌশিকী গোস্বামী



অদম্য চাহিদাদের ঘিরে সমসাময়িক পরিস্থিতি নিজের আবেগ তার প্রতিটা পদক্ষেপ, ভাবনার পরিধি সবটা জুড়ে যখন বিতশ্রদ্ধ হয়ে যাই নিজের ওপর বা সমাজের ওপর বা নিজের কাছের মানুষদের ওপর তখন ওই সাদা চুল সাদা দাড়ির মানুষটা প্রলেপের কাজ করে সারা দেহ মন জুড়ে, প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কে সজীব করে দেয়। বাঁচিয়ে রাখার রসদ যোগায়।প্রতিটা ক্ষণে তাঁর উপস্থিতির এক উজ্জ্বল মহিমা আরও দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলার অঙ্গীকার বদ্ধ করে।
তাঁর সৃষ্টির ভোগাস্বাদনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি আছে। যেমনটা "শেষের কবিতা" পড়ে প্রেম খুঁজে পাই, তেমনি সামাজিকতার চালচিত্র হিসেবে "রক্তকরবী" এক অনন্য উদাহরণ। তেমনি ছোটবেলা টা মনে করিয়ে দেয় "পোস্টমাস্টার", "অমল ও দইওয়ালা"। ঠিক তেমনি "বলাই" শেখায় প্রকৃতি প্রেম। সম্পর্কের ওঠা নামা যে জীবনের একটা অংশ তা তাঁর "চোখের বালি" ও "নৌকাডুবি" পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায়। সহজ পাঠ হতে যে যাত্রার সূত্রপাত তার শেষ পংক্তি টা লেখা থাকে 'শেষের কবিতায়'
"হে বন্ধু বিদায়।"
ওঁনার প্রতিটা লেখার মাধ্যমে তিনি সময়ের পরিপ্রেক্ষিত রচনা করে গেছেন। তাই তো উনি আমার ঠাকুর আমাদের প্রাণের ঠাকুর।।

ভাবনার আলোকে রবীন্দ্রনাথ ..............কনিষ্ক দেওঘরিয়া


একদিন আলোর পাশে এসে দাঁড়ালাম ,
বারবার আলোর পাশে দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে ।
অন্ধকারের মধ্যে দুঃখ গুলো দেখা যায় না বলে মানুষ অন্ধকারকে অবহেলা করে । আসলে মানুষ দুঃখ পেতে চায় । কবিতা গান গল্প এসবের মধ্যে যে প্রাণ লুকিয়ে আছে তা বুঝতে গ্যালে আলোর পাশে দাঁড়ানোর জায়গাটা শক্ত করে নেওয়া ভীষণ জরুরী । আমরা  মাঝেমাঝেই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হই - আবার রবীন্দ্রনাথকে পড়ে পারও পেয়ে যাই । দুঃখ যন্ত্রণা প্রেম ভালোবাসা আনন্দ - এই আবেগের কোনো বয়স নেই রবীন্দ্রনাথ পড়েই তা স্পষ্ট হয়ে গেল । যতটুকু রবীন্দ্রনাথ বুঝেছি তার সারমর্ম এই যে , নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে ভেঙে - গড়ে নতুন করে-পুরোনো ভাবে সৃষ্টি ও ধ্বংস করা সম্ভব । আর যে আলোটির সামনে জীবনকে প্রতিনিয়ত মোচড় খেতে দেখি সেই আলোটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।।

যা কিছু রাবীন্দ্রিক.... আরাধনা মাহাতো



সশরীরে না থেকেও একসাথে হাজার হাজার সম্পর্কের সম্পৃক্তকরণ একজনের পক্ষেই মর্যাদার সাথে পালন করা সম্ভব , তিনি আর কেউ নন - রবীন্দ্রনাথ ।
না তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নন , তিনি হলেন প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ।

" ভোরের তিমির বিদারী আকাশে ওঠে যে রবি
সে তো মুক্তির রক্তিম আলো ছড়ানো তুমি , কবি ..... "

পারিজাত বিকাশ রায়ের এই লেখাই যেন বারবার বলে দেয়   রবি ছাড়া দিনের শুরু সম্ভব নয় । রবীন্দ্রনাথ মানেই সূর্যোদয় থেকে গোধূলির শেষ সূর্য্য আর সূর্যাস্ত থেকে নতুন ভোরের প্রথম রক্তিম সূর্য্য । রবীন্দ্রনাথ মানেই আট থেকে আশির সেই প্রাণের রবি যিনি  জড়িয়ে আছেন মনের মণিকোঠায় ।

' রবীন্দ্রনাথ ' শব্দটার উচ্চারণ যখন ঠিকমতো স্পষ্ট নয় তখন থেকেই চোখের কাছে চেনা মুখ হয়ে যায় ' সহজ পাঠ ' এর প্রচ্ছদ ।
জ্বাল দেওয়া চুলোর ধোঁয়ায় মিশে থাকা আর দোতলার নীচে পাখার হওয়ায় বসা ছেলে দুটোর হাতেই থাকে সহজ পাঠের একই চেনা বই ।

একটা সময় যৌবন হানা দেয় । নদী যেমন ভরা যৌবনে উত্তাল , মানুষও তেমনি যৌবনে টগবগিয়ে ফুটে অহর্নিশ । তখন জীবনে আসে এক অন্য রবীন্দ্রনাথ । পরিচয় হয় " সোনার তরী " , " চিত্রা " ।
দিনরাত কানে বাজে " ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে নামটি লিখো "
রবীন্দ্রনাথের যেন তখনও যৌবন কাটেনি । রবীন্দ্রনাথ প্রেমিক হয়ে মনে বসেছেন অনেকের ।

আস্তে আস্তে যৌবনের ঘোর কাটে , সময় আর পরিস্থিতির ঘোরটোপে তখন নাজেহাল মন । একটা স্থিরতা গা বেয়ে জাঁকিয়ে বসে নিজের মতো করেই । তখন শেষ দু পাতায় আটকে " শেষের কবিতা " । ততদিনে গানের ধরণও বদলে গেছে , তবে রবীন্দ্রনাথ বদলায়নি । শুধু রবীন্দ্রনাথের যৌবন কেটে গেছে । মাঝরাতেও গুনগুন করে ঠোঁট দুকলি গাইয়ে দেয় " তবে তুমি যাহা চাও , তাই যেন হই ...."

একটা সময় পর পরিণতি আসে জীবনে , রবীন্দ্রনাথ তখন হয়ে উঠেছেন কঠিন থেকে কঠিনতর । ঘরে তখন আর সহজ ভাষার রবীন্দ্রনাথ নেই । জোরকদম পড়া চলছে " ঘরে বাইরে " , " নৌকা ডুবি " , " গোরা " ।
" চোখের বালি " র প্রতি একটা টান অনভব হয়ে গেছে ততদিনে ।

এতদিন চশমা খুলে কোনোদিন ভাবার সুযোগ হয়নি " সহজ পাঠ " থেকে জীবন টা " নৌকা ডুবি " তে এসে ঠেকেছে । একটা পেপার  কভারের বই কখন একটা উপন্যাস হয়ে যায় জীবন বোঝার সুযোগ দেয়না , রবীন্দ্রনাথও দেননি ।

রবীন্দ্রনাথের প্রতিটা চরিত্রের খোঁজ শুরু হয় বাস্তবে । চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে , মনে হয় তারা বই এর মায়া কাটিয়ে উঠে এসেছে আমাদের চারপাশে । রবীন্দ্রনাথ গান লেখেননি , কবিতা লেখেননি , গল্প লিখেছেন শুধুই - আমাদের গল্প , প্রতিটা মানুষের আলাদা আলাদা গল্প ।

রবীন্দ্র সৃষ্টি যেমন একজন সদ্য প্রেমে ফেরা প্রেমিকের কাছে প্রেমের অলঙ্কার ঠিক তেমনি বিচ্ছেদের আগুনে অনর্গল পুড়তে থাকা বিরহিনীর কাছে বিরহের অন্ত্যমিল ।
তাঁর প্রতিটা লাইন যেন প্রতিটা মানুষের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হতেই এসেছে , একটা মানুষকেও ছাড়তে রাজি নয় তারা । গতপ্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক ছিলেন , বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক আর বলাই বাহুল্য ভবিষ্যতের সমস্ত প্রজন্মের কাছেই রবীন্দ্রনাথ আধুনিক থেকে যাবেন চিরকাল । যুগের পর যুগ যিনি আধুনিক , চির নতুন তিনিই কবি । তাঁর কাব্য সৃষ্টির পরই সার্থক ....

যে মানুষ রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে কোনোদিন চর্চা করেনি , যে মানুষ রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রতি বিশেষ আগ্রহী নয় , যে মানুষ প্রিয় কবির জায়গা থেকে বরাবর রবীন্দ্রনাথ কে বাদ দিয়ে এসছে তার ফোনেও বাজতে শুনেছি " যখন পড়বে না মোর পা এর চিহু ... "
একজন লেখকের জীবন বৃত্তান্ত জেনে , বেঁচে থাকার প্রানন্তকর লড়াই চিনে তাঁকে কুর্ণিশ জানানো আর সাধুবাদের মুকুট পরিয়ে দেওয়ার লোক কোনোকালেই কম পড়েনি ।
রবীন্দ্র সৃষ্টির কিচ্ছু লাগেনা , বহুবর্ণে খচিত কলমের নির্যাস  সমস্ত কিছু বইয়ে নিয়ে বেড়ায় । ঠিক এইখানেই রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেছেন অনেক অনেক আগে । এখানেই রবীন্দ্রনাথের স্বার্থকতা , রবীন্দ্র সৃষ্টির পরিপূর্ণতা ।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের মুক্ত হাওয়ার সঙ্গে পরিচয়ের হাতে খড়ি দিয়ে গেছেন । চার দেওয়াল যে সৃষ্টিসুখের কত বড়ো বিরোধী তা তিনি বহু বছর আগেই বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন । শাসনের আরেক নাম যে আদর তা চিরকাল অজানাই থেকে যেত রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। রবীন্দ্রনাথ মনের শান্তি , রবীন্দ্রনাথ প্রাণের আরাম ।

বেঁচে থাকতে কোনোদিন কোনো কবি তাঁর প্রাপ্য সম্মানের সম্পূর্ণটা পাননি , রবীন্দ্রনাথের প্রতিও তার ব্যতিক্রম হয়নি । তাঁর সৃষ্টির আকরের নির্যাস এক জীবনে আস্বাদন করা দুর্লভ এর চেয়েও বেশি কিছু । রবীন্দ্র কথার শেষ হয়না , শেষ করে দিতে হয় । তবুও দিনের শেষে লেগে থাকে .....
" তোমারে দিয়েছিনু সে তোমারই দান ,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায় ... "
আমরা রবীন্দ্রনাথকে আদতে কিছুই দিতে পারিনি , রবীন্দ্র সৃষ্টির মূল্যায়ন আমাদের সীমিত ক্ষমতায় কোনদিনই কুলোবেনা । রবীন্দ্রনাথ একটা আকাশ , আকাশের শেষ হয় না । বরং সারা পৃথিবী সেই আকাশে ডানা মেলে , উন্মাদনায় মেতে থাকে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২০

করোনার ভ্যাকসিন সেপ্টেম্বরে !


অসময়ে কিছুটা হলেও আশা জাগছে , মানুষের মনে । একদিকে প্লাজামা থ্যারাপি যেমন কার্যকরী হয়ে উঠছে - তেমনি প্রতিষেধকের আশা জোগাচ্ছে পুনের সিরাম ইনস্টিটিউট । এই সিরাম ইনস্টিটিউট অস্কফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মেলবন্ধনে করে যাচ্ছে করোনার টিকা আবিষ্কারের কাজ । তাদের দাবি মে মাসের মধ্যে ই তারা ট্রায়াল শুরু করতে পারবে । সেপ্টেম্বরে ভারতে পাওয়া যাবে করোনার টিকা । দাম পড়বে ১০০০ টাকার মতো ।

বেশিবার পড়া