কেন জানি না , সে দিনটা আমার খুব মনে পড়ে , তখন আমরা মিডিল স্কুলের ছাত্র । বিদ্যালয় গিয়ে শুনলাম আমাদের দুইটি ক্লাস উচ্চ বিদ্যালয়ে যুক্ত হয়েছে । উচ্চ বিদ্যালয় আগে তুলিনে ছিলনা , সাধু বাবা এসে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন । পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী ৫ম থেকে ১১শ শ্রেণী নিয়ে হায়ার সেকেণ্ডারি পাঠক্রম শুরু হয় । তাই আমরা দুইটি ক্লাসের পড়ুয়া ও তিনজন শিক্ষক এবং একজন করনিক সহ হেঁটে হেঁটে উচ্চ বিদ্যালয়ে যাই সঙ্গে ডেক্স বেঞ্চ টেবিল চেয়ার । মনে হয় " আজ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে / শাখে শাখে পাখী ডাকে / কত শোভা চারিপাশে / আজকে মোদের বড়ই খুশির দিন / ঘরের বাঁধন ছেড়ে মোরা হয়েছি স্বাধীন " হাঁটতে হাঁটতে আমরা সবাই পৌঁছে যাই লালমাটির ধূ ধূ প্রান্তরের মাঝে শান্ত পরিবেশের স্কুলে " এলেম নতুন দেশে " জয় সিয়া রাম হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুল পাগল বাবা রাঘবানন্দের যেন তপভূমি ।
চার কক্ষ বিশিষ্ট একটি পাকা বাড়িতে ৭ম , ৮ম ,৯ম ও ১০ম শ্রেণী পড়ানো হোত । অপরদিকে চালাঘরে কয়েকটি শ্রেণীকক্ষ সহ বোডিং । একটি চালাঘরের কক্ষ নির্দিষ্ট হয় আমাদের শ্রেণীর জন্য , অনেক শিক্ষক মশাই এখানে শিক্ষা প্রদান করেন , বিভিন্নজন বিভিন্ন বিষয়ে - সেইদিন টিফিনের সময় একজন সহপাঠী বলে উঠল " এই দ্যাখ সাধুবাবা আসছে " গারদ বিহীন গবাক্ষের ভিতর দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করি । দূর হতে আলোকিত হন সেই মহামানব " ঐ মহা মানব আসে / দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে ............... । " শুশ্রূ গুম্ফ মণ্ডিত বিভূতি বিভূষিত মস্তোকপরি জটা লালকাপড়ের ফিতে দিয়ে চুড়ো করে বাঁধা , লাল কৌপিন , কাঁধে লাল কাপড় দিয়ে তৈরী ঝোলা , পায়ে খড়ম , কোন শিব সহচর যেন শিবলোক থেকে অবতরন করেছেন । তিনি স্কুলের মধ্যে আসেন ।
শিক্ষক মশাই শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করেন আমাদের পঠন - পাঠন শুরু হয়ে যায় । সাধুবাবার সান্নিধ্য পাবার জন্য কেমন যেন মনছটপট করে উঠে । পরে অনেকবার তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছি । তিনি বিদ্যালয়ে এলে সবাই তাকে প্রণাম নিবেদন করেছি । তখন তিনি বিদ্যালয়ে রাত্রীযাপন করতেন । প্রভাতকালীন পঠন - পাঠনে তাকে দেখেছি স্নানান্তে সারা অঙ্গ বিভূতি বিভূষিত হতেন স্বহস্তে । তারপর তিনি কয়েকটি নিমপাতা খেতেন তাছাড়া তিনি অন্য কোন খাবার খেতেন না , কেউ মিষ্টান্ন দিলে উপস্থিত সকলের মধ্যে বিতরণ করে যৎ সামান্য গ্রহণ করতেন । পকুড়ি দিলে খেতেন । জয় সিয়া রাম স্কুলে সরস্বতী পুজোর পর বিসর্জনের দিন শোভাযাত্রাকরে প্রতিমা মুরী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । ফেরার পথে আমি বাড়িতে প্রবেশ করি , পরে বাইরে গিয়ে দেখি সাধু বাবা প্রত্যাবর্তনকারী সবাইকে আমাদের বাড়ির সামনে বদি ময়রার দোকানথেকে থালাভর্তি পকুড়ি বিতরণ করছেন । আমি আবার ছুটে গিয়ে সেই দলে যোগ দিই , সাধু বাবা আমার হাতে পকুড়ি দেওয়াকালীন জিজ্ঞাসা করেন - তুম মুরী গেয়াথা ? ভক্তি যেন আমার উথলে ওঠে বলি - হ্যা বাবা গয়াথা । সেই থেকেই হয়ত পকুড়ির প্রতি আমার স্পৃহা তৈরি হয়ে আছে ।
তারকাছে সবই ছিল ভগবাণের রূপ । তাই তিনি সব কথাতেই ভগবাণের কথা উল্লেখ করতেন , বাচ্চো ভগবাণ , মাষ্টার ভগবাণ , পরিচিত সকলের নামের সঙ্গে ভগবাণ শব্দটি যুক্তকরে ডাকতেন । সব কিছুতেই তিনি হয়ত ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারতেন । জগৎ কল্যাণের জন্য তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন । প্রথমে তিনি শ্রী শ্রীহরি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । নিত্যপূজার ব্যাবস্থা করেছিলেন যা আজ ও হয়ে চলেছে । প্রতিবৎসর মন্দিরে নাম সংকীর্তনের আয়োজন করতেন যা এখনো আয়োজিত হয় । তিনি নয়টি কুঞ্জে একই সাথে নামসংকীর্তন করিয়েছিলেন । তাঁর সেই নির্দিষ্ট স্থানে নয়টি মন্দির নির্মিত হয়েছে । সেখানে বেশ কেয়েক বছর পরে পরে নবকুঞ্জ সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হয় । যা অত্যন্ত ব্যায়বহুল । তাঁর জীবদ্দশায় তিনি একবার চোদ্দ মাদল ও একবার নবকুঞ্জ করিয়ে গেছেন । শৈশবে দেখেছি তিনি অনুচরবর্গ সমবিব্যাহারে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হরিনাম সংকীর্তনের চাঁদা সংগ্রহ করতেন । দরজায় এলে মনে হতো " তেরে দোয়ার খাড়া ভাগবাণ / ভকত ভরদেরে ঝোলি " এইটি তাঁর প্রিয় গানছিল , তাছাড়া তাঁর প্রিয় গানছিল " পিঞ্জরে কে পানছি তেরা দর্দ না জানে কোই " - তিনি এলে সকলেই সাধ্য মত অর্থ তার অনুচরবর্গের হাতের থলিতে প্রদান করতেন সেই সময় দেখেছি নামে নামে রসিদ দেওয়া বা খাতায় লিখে রাখা হতো না ।
সেই বারেই প্রথমবার ঠাকুমার সঙ্গে ( অত্যন্ত শৈশবে আমি মাতৃহারা ) হরি মন্দির প্রাঙ্গনে গেছি । মহা সমারোহে নাম সংকীর্তন চলছে । সবাই ভক্তিভরে নামসংকীর্তন শুনে চলেছেন ---। দেখি সাধুবাবা একজন খোলবাদকের কাঁধ থেকে খোল নিয়ে বাজাতে শুরুকরলেন । জলদ গম্ভীর কন্ঠে খোলের বোল উচ্চারণ করে চলেছেন । নয়নাভিরাম এক অপার্থিব দৃশ্য । সমস্ত শ্রোতারা বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে , সবাই এক অনাবিল আনন্দে আত্মহারা , বৈকুণ্ঠ থেকে শ্রীহরি মাতা লক্ষীসহ যেন মন্দিরে বিরাজ করছেন , তাঁদের কেই যেন তিনি নৃত্য প্রদর্শন করছেন , নামের সঙ্গে মৃদঙ্গ ও মন্দিরার শব্দে আকাশ বাতাস মুখরিত । ভক্তরা নিজ নিজ ইষ্টের রূপকল্পনা করে চলে । কৃষ্ণভক্তরা রাসলীলার রাধাকৃষ্ণের নৃত্য দেখতে পান । শিব ভক্তরা দেখেন কৈলাস থেকে শিব নটরাজ হয়ে অন্তরীক্ষে নৃত্য শুরু করেছেন । আর যারা সব সময় বিষয় কর্মে আবদ্ধ , যারা ঘর ছেড়ে বাইরে যাবার সময় পান না , তারাও সেদিন ঘরের মধ্যে শুনতে পান ------
ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে
কী সঙ্গীত ভেসে আসে ..............
বলে আয়রে ছুটে আয়রে ত্বরা
হেথা নাইকো মৃত্যু , নাইকো জ্বরা
![]() |
| লেখক - ডাঃ শংকর চন্দ্র আশ গ্রাম - তুলিন , জেলা - পুরুলিয়া বয়স - ৭০ বছর |


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন