সশরীরে না থেকেও একসাথে হাজার হাজার সম্পর্কের সম্পৃক্তকরণ একজনের পক্ষেই মর্যাদার সাথে পালন করা সম্ভব , তিনি আর কেউ নন - রবীন্দ্রনাথ ।
না তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নন , তিনি হলেন প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ।
" ভোরের তিমির বিদারী আকাশে ওঠে যে রবি
সে তো মুক্তির রক্তিম আলো ছড়ানো তুমি , কবি ..... "
পারিজাত বিকাশ রায়ের এই লেখাই যেন বারবার বলে দেয় রবি ছাড়া দিনের শুরু সম্ভব নয় । রবীন্দ্রনাথ মানেই সূর্যোদয় থেকে গোধূলির শেষ সূর্য্য আর সূর্যাস্ত থেকে নতুন ভোরের প্রথম রক্তিম সূর্য্য । রবীন্দ্রনাথ মানেই আট থেকে আশির সেই প্রাণের রবি যিনি জড়িয়ে আছেন মনের মণিকোঠায় ।
' রবীন্দ্রনাথ ' শব্দটার উচ্চারণ যখন ঠিকমতো স্পষ্ট নয় তখন থেকেই চোখের কাছে চেনা মুখ হয়ে যায় ' সহজ পাঠ ' এর প্রচ্ছদ ।
জ্বাল দেওয়া চুলোর ধোঁয়ায় মিশে থাকা আর দোতলার নীচে পাখার হওয়ায় বসা ছেলে দুটোর হাতেই থাকে সহজ পাঠের একই চেনা বই ।
একটা সময় যৌবন হানা দেয় । নদী যেমন ভরা যৌবনে উত্তাল , মানুষও তেমনি যৌবনে টগবগিয়ে ফুটে অহর্নিশ । তখন জীবনে আসে এক অন্য রবীন্দ্রনাথ । পরিচয় হয় " সোনার তরী " , " চিত্রা " ।
দিনরাত কানে বাজে " ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে নামটি লিখো "
রবীন্দ্রনাথের যেন তখনও যৌবন কাটেনি । রবীন্দ্রনাথ প্রেমিক হয়ে মনে বসেছেন অনেকের ।
আস্তে আস্তে যৌবনের ঘোর কাটে , সময় আর পরিস্থিতির ঘোরটোপে তখন নাজেহাল মন । একটা স্থিরতা গা বেয়ে জাঁকিয়ে বসে নিজের মতো করেই । তখন শেষ দু পাতায় আটকে " শেষের কবিতা " । ততদিনে গানের ধরণও বদলে গেছে , তবে রবীন্দ্রনাথ বদলায়নি । শুধু রবীন্দ্রনাথের যৌবন কেটে গেছে । মাঝরাতেও গুনগুন করে ঠোঁট দুকলি গাইয়ে দেয় " তবে তুমি যাহা চাও , তাই যেন হই ...."
একটা সময় পর পরিণতি আসে জীবনে , রবীন্দ্রনাথ তখন হয়ে উঠেছেন কঠিন থেকে কঠিনতর । ঘরে তখন আর সহজ ভাষার রবীন্দ্রনাথ নেই । জোরকদম পড়া চলছে " ঘরে বাইরে " , " নৌকা ডুবি " , " গোরা " ।
" চোখের বালি " র প্রতি একটা টান অনভব হয়ে গেছে ততদিনে ।
এতদিন চশমা খুলে কোনোদিন ভাবার সুযোগ হয়নি " সহজ পাঠ " থেকে জীবন টা " নৌকা ডুবি " তে এসে ঠেকেছে । একটা পেপার কভারের বই কখন একটা উপন্যাস হয়ে যায় জীবন বোঝার সুযোগ দেয়না , রবীন্দ্রনাথও দেননি ।
রবীন্দ্রনাথের প্রতিটা চরিত্রের খোঁজ শুরু হয় বাস্তবে । চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে , মনে হয় তারা বই এর মায়া কাটিয়ে উঠে এসেছে আমাদের চারপাশে । রবীন্দ্রনাথ গান লেখেননি , কবিতা লেখেননি , গল্প লিখেছেন শুধুই - আমাদের গল্প , প্রতিটা মানুষের আলাদা আলাদা গল্প ।
রবীন্দ্র সৃষ্টি যেমন একজন সদ্য প্রেমে ফেরা প্রেমিকের কাছে প্রেমের অলঙ্কার ঠিক তেমনি বিচ্ছেদের আগুনে অনর্গল পুড়তে থাকা বিরহিনীর কাছে বিরহের অন্ত্যমিল ।
তাঁর প্রতিটা লাইন যেন প্রতিটা মানুষের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হতেই এসেছে , একটা মানুষকেও ছাড়তে রাজি নয় তারা । গতপ্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক ছিলেন , বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক আর বলাই বাহুল্য ভবিষ্যতের সমস্ত প্রজন্মের কাছেই রবীন্দ্রনাথ আধুনিক থেকে যাবেন চিরকাল । যুগের পর যুগ যিনি আধুনিক , চির নতুন তিনিই কবি । তাঁর কাব্য সৃষ্টির পরই সার্থক ....
যে মানুষ রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে কোনোদিন চর্চা করেনি , যে মানুষ রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রতি বিশেষ আগ্রহী নয় , যে মানুষ প্রিয় কবির জায়গা থেকে বরাবর রবীন্দ্রনাথ কে বাদ দিয়ে এসছে তার ফোনেও বাজতে শুনেছি " যখন পড়বে না মোর পা এর চিহু ... "
একজন লেখকের জীবন বৃত্তান্ত জেনে , বেঁচে থাকার প্রানন্তকর লড়াই চিনে তাঁকে কুর্ণিশ জানানো আর সাধুবাদের মুকুট পরিয়ে দেওয়ার লোক কোনোকালেই কম পড়েনি ।
রবীন্দ্র সৃষ্টির কিচ্ছু লাগেনা , বহুবর্ণে খচিত কলমের নির্যাস সমস্ত কিছু বইয়ে নিয়ে বেড়ায় । ঠিক এইখানেই রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেছেন অনেক অনেক আগে । এখানেই রবীন্দ্রনাথের স্বার্থকতা , রবীন্দ্র সৃষ্টির পরিপূর্ণতা ।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের মুক্ত হাওয়ার সঙ্গে পরিচয়ের হাতে খড়ি দিয়ে গেছেন । চার দেওয়াল যে সৃষ্টিসুখের কত বড়ো বিরোধী তা তিনি বহু বছর আগেই বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন । শাসনের আরেক নাম যে আদর তা চিরকাল অজানাই থেকে যেত রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। রবীন্দ্রনাথ মনের শান্তি , রবীন্দ্রনাথ প্রাণের আরাম ।
বেঁচে থাকতে কোনোদিন কোনো কবি তাঁর প্রাপ্য সম্মানের সম্পূর্ণটা পাননি , রবীন্দ্রনাথের প্রতিও তার ব্যতিক্রম হয়নি । তাঁর সৃষ্টির আকরের নির্যাস এক জীবনে আস্বাদন করা দুর্লভ এর চেয়েও বেশি কিছু । রবীন্দ্র কথার শেষ হয়না , শেষ করে দিতে হয় । তবুও দিনের শেষে লেগে থাকে .....
" তোমারে দিয়েছিনু সে তোমারই দান ,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায় ... "
আমরা রবীন্দ্রনাথকে আদতে কিছুই দিতে পারিনি , রবীন্দ্র সৃষ্টির মূল্যায়ন আমাদের সীমিত ক্ষমতায় কোনদিনই কুলোবেনা । রবীন্দ্রনাথ একটা আকাশ , আকাশের শেষ হয় না । বরং সারা পৃথিবী সেই আকাশে ডানা মেলে , উন্মাদনায় মেতে থাকে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ।