পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ৮ মে, ২০২০

" ঠাকুর যেমন " ............. স্বপন বিশ্বাস


          আমার চোখে রবীন্দ্রনাথ " -- বিষয়টি মূলত স্মৃতি নির্ভর  , আর স্মৃতি হ'ল স্বভাব দূর্বল। তাই একটু সন্ধান করে করে তাদের সংগ্রহ করে সময় সারনী অনুসারে সাজিয়ে নিতে হবে।
       বাল্যে লক্ষ্মী, গণেশ, হনুমান সহ অনেক ঠাকুরের সাথে প্রায় একাসনে বিরাজমান ছিলেন রবীন্দ্রনাথ -- প্রসাদ ও কাঁসর-ঘন্টা ছাড়াই ফুল মালা চন্দন চর্চিত "ঠাকুরের" ছবিতে ধূপ দেখানো হোতো নিয়ম মেনে। আর বিশেষ পূজার দিন ২৫শে বৈশাখ -- সেদিন স্কুল-কলেজ থেকে পাড়ার মঞ্চ মুখরিত হোতো গীত-বাদ্যে-আচারে ; সেদিন হৃদয় থেকে উৎসারিত হোতো রবীন্দ্র-মন্ত্র -- "২৫শে বৈশাখ  হে নূতন .... "; আর রবিঠাকুরের পূজায় আমার সবথেকে ভালোলাগার দিকটি ছিল উপবাসহীনতা।

          আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন পাঠ্যের বাধকতা -- ভালোলাগার বাঁধন তখনও পর্যন্ত শেকড় ছড়ায়নি ; তুলনামূলকভাবে শরৎচন্দ্র, বিশেষ করে ' শ্রীকান্ত ' গোগ্রাসে গিলছি। ১৬-১৭ বছর বয়স অবধি গদ্য সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, ডায়েল সাহেব, শিবরাম, সত্যজিৎ, সুনীল ইত্যাদির কাছে রবীন্দ্রনাথ গোহারা হারছেন, এমনকি সহজলভ্য স্বপন কুমারও কম যান না। যদিও অনেক পরে জেনেছিলাম যে ঋষি রবীন্দ্রনাথ উচ্চ-কোটির কবি সাহিত্যিকদের জন্য লেখেন এবং আরও পরে অনুভব করলাম উপনিষদ না পড়ে রবীন্দ্র পাঠেও সমান পূণ্য।

          যাইহোক, পরিবর্তনশীল জগতে সময়ের সাথে সাথে আমরা নিজেদের মতো করে পাল্টে নি শাশ্বত রবীন্দ্রনাথকে। এদিকে ১৮ -- ১৯ বছর বয়সে শুনলাম রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি এবং সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার এক জমিদার পুত্রের সাধের বিলাস হ'ল তাঁর সাহিত্য রচনা। কিন্তু তবুও  পরিক্ষার খাতা থেকে জলসা সর্বত্রই 'ঠাকুরের' দেবতুল্য  দৃপ্ত আনাগোনা তখনও অবিরাম। এমনকি সামঞ্জস্যপূর্ণ কোটেশন মনে না পড়লে সদ্য শোনা  কোনও গানের দু এক লাইন ইনর্ভাটেড কমার মধ্যে ঢুকিয়ে রবীন্দ্রনাথের বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও সেই সময়ের উত্তরপত্রগুলিতে পাওয়া যেত, যেমন --
" তাইতো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন --
      'যা চেয়েছি আমি তা পাই না
        যা পেয়েছি কেন তা চাই না ....'  "
পরে সেই উত্তরপত্রের মালিকের সাথে পূর্ব করপোরাল পানিশমেন্ট যুগে বাংলা ক্লাসে কী ঘটতো তা বুঝতে পারার জন্য কোনো পুরস্কার নেই।

       তা এই আপেক্ষিকবাদের পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ বদলে যেতে থাকেন সময় থেকে সময়ে, বয়সের ধাপে ধাপে । আমি যে আপোষহীন ছাত্রনেতাকে নিষিদ্ধ কর্মে রত হতে দেখেছি , অভিসারের লক্ষ্যে  তাকেই হারমোনিয়ামে প্রাণপণে তুলতে দেখেছি -- " ন্যায় অন্যায় জানিনে জানিনে জানিনে ... " । তখনই বুঝেছি রবি কবির দ্বার সবার জন্যই অবারিত -- আশ্রয় প্রশ্রয়ের বাছবিচার সেখানে নেই ; তাঁকেই সবার দরকার -- তাই গোপনে বা সোচ্চারে অবাধ প্রবেশ তাঁর দরবারে।

            উৎকৃষ্ট সাহিত্য হোক বা ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী -- গীতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, তাই কালজয়ী। ঠিক তেমনিই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে রবীন্দ্র রচনা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সঙ্গীত, কাব্য, সাহিত্য, কলার পুরুষ সরস্বতী হলেন রবীন্দ্রনাথ। বিষয় ভাবনার ব্যপ্তি ও বৈচিত্র্যে তিনি অসজ্ঞাত  -- যেকোন ভাবনার রঙের যেকোন শেড্ তাঁর কাজের কোলাজে ঠিক খুজে পাওয়া যাবে  -- যার যেমন প্রয়োজন খুজে নিতে পারে তাঁর সম্ভার থেকে।

          '  জল পড়ে পাতা নড়ে ' থেকে শুরু করে সীমানা ছাড়িয়ে অসীমে তাঁর বিচরণ -- যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানের স্থান কাল পাত্র অনুযায়ী ও নিজের চিন্তন অনুসারে তিনি বিমোচিত হন  , আবার সময়ের পথ ধরে এগিয়ে গেলে ফেলে আসা সময়-বিন্দুর রঙ রস গন্ধ অন্য রূপে ধরা দেয়। অনেকেই আবার সেখান থেকেই আগামীর সন্ধান পায়।

           ভাবনার ব্যবহারিক প্রয়োগে ও যাপনে তিনি ছড়িয়ে আছেন, জড়িয়ে আছেন  --  সমঝদার, ভক্ত, রসিক, সমালোচক ও শিল্প-কীটেরা ঠিক তাঁকে খুজেঁ পেতে নিয়ে মধু খায়, মাতাল হয়, গান গায়, রসদ জমায় ও সমৃদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথ হলেন বহতি গঙ্গা  --- ডুবকি লাগাও আর সত্য-শিব-সুন্দর পাও। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বেশিবার পড়া