পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ৮ মে, ২০২০

ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথ এবং কোভিড ১৯ ও তার অনুগামী সংকটের মোকাবিলায় তাঁর প্রাসঙ্গিকতা .............হরিসাধন চন্দ্র



    উপনিষদের প্রত্যয় ছোটবেলা থেকেই তাঁর 'বাবামশায়'-এর সচেতন শিক্ষা ও সাহচর্য এবং ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অন্তরজগতে প্রবেশ করে তারপর নিজের নানা অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাওয়া উপলব্ধির ফলে এমন এক বৃহত্-মহত্ স্থান অধিকার করে নিয়েছিল যে, সেটাই তাঁর চিন্তন ও যাপনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল । তাঁর অগণিত রচনার মধ্যে তার প্রতিফলন  পাওয়া যায়। এখন দেখা যাক বিশ্বব্যাপী কোভিড ১৯ ও তার অনুগামী সংকটগুলির মোকাবিলায় তা কতটা প্রাসঙ্গিক । 
     উপনিষদের মূল বার্তা হল, সবকিছু মিলিয়ে বিরাজ করছেন এক সচেতন অখণ্ডতা অর্থাত্ ব্রহ্ম। এর মধ্যে ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান --- 'সত্যম্' অর্থাত্ চিরন্তন ও অবিসংবাদিত, 'শিবম্' অর্থাত্ মঙ্গল  এবং 'সুন্দরম্' অর্থাত্ আনন্দদায়ক আর তাই প্রেমজাগরূক । ব্রহ্ম নিজেকে প্রকৃতি রূপে প্রকাশ করলে এই বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকট হয় ।  তখন তাকেই বলা হয় সগুণ ব্রহ্ম । এই বিশ্বব্যাপী প্রকাশ তাঁর ঐশ্বর্য, আর ঐশ্বর্য আছে বলেই তিনি 'ঈশ্বর'। আর প্রকাশিত রূপের অন্তরালে যে অরূপ সত্তা  থাকে তা হল নির্গুণ ব্রহ্ম । স্বরূপত উভয়েই এক । ব্রহ্মের এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কোনোভাবে ব্যাঘাত ঘটলেও আবার নিজের স্বরূপে ফিরে আসাটাই এর চরম পরিণতি। এই প্রতীতি ধ্বনিত হয়েছে তাঁর সিংহভাগ লেখাতেই, আর যেখানে তা হয়নি সেখানেও কিন্তু এই প্রতীতির বিরুদ্ধ কোনো ভাবের প্রকাশ ঘটেনি । তাঁর ওই ঔপনিষদিক দর্শনের বাহক কয়েকটি গানের অংশ উদ্ধৃত করা গেল : 
১) 'সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে ।'
 ২)তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি যাই 
কোথাও দুঃখ কোথাও মৃত্যু  কোথা বিচ্ছেদ  নাই
- - - - -------------- ----- ------  ------- ------- ---- ---- ----- --     ------
হে পূর্ণ তব চরণের কাছে 
 যাহা কিছু সব আছে আছে আছে 
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই 
নিশিদিন কাঁদি তাই।
৩)  বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিরাজ      
 সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও ।
৪)আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া 
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া । 
৫)রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি । 
                                      ( গীতবিতান )
 এই সচেতন অখণ্ডতাকে নিজের অন্তরে প্রত্যক্ষভাবে  উপলব্ধি করতে পারলে তখন সারা বিশ্বের সমস্ত কিছু  মিলেই তো 'আমি' ----এই উপলব্ধি হয়।অর্থাত্ তখন রক্ত-মাংসের দেহটার মধ্যে সীমাবদ্ধ 'আমি'টা বাড়তে বাড়তে অসীম হয়ে ওঠে ।এটাই রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় বড়ো 'আমি'। তখন আর ঈশ্বর অর্থাত্ উপাস্য আর ভক্ত অর্থাত্ উপাসকের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না, অর্থাত্ উভয়ের আর দুটি পৃথক সত্তা থাকে না। তখন দ্বৈত পর্ব শেষ হয়ে অদ্বৈত সত্তায় পৌঁছে যায় উপাসক । তখন উপাসকের উপলব্ধি  : '  বিভিন্ন উপনিষদের নির্যাসের সুসংহত রূপ বেদান্ত দর্শনে এই অদ্বৈতবাদেরই সুবিস্তৃত ও যুক্তিনিষ্ঠ রূপটি পাওয়া যায় । কিন্তু এই বড়ো আমির পর্যায়ে পৌঁছানো তো সহজ নয়। অজ্ঞানতার বশে অহং বোধ ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তার বেড়া দিয়ে আমাদের আটকে রেখে দেয়, বড়ো হয়ে উঠতে দেয় না । সেই  বেড়া ভেঙে বিশ্বসত্তার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আর্তি নিয়েই ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করে, প্রার্থনা জানায়, যাতে তিনি উপাসককে নিজের মধ্যে গ্রহণ করে নেন। এতেই চলে ভক্ত ও ভগবানের লীলা। এতে কত মান-অভিমান, আশা-হতাশা, আনন্দ-বিষাদ । এই লীলা আস্বাদনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই ব্রহ্ম একমদ্বিতীয়ম্ হওয়া সত্ত্বেও বহু ও বিচিত্র রূপে প্রকাশ করেন। কিন্তু সেই সব রূপ মিলেই তাঁর প্রকট সত্তা । এই অদ্বৈতবাদের উপলব্ধি পুরোপুরিভাবে যাঁর মনে জাগবে, তিনি কাউকে ভয় পাবেন না, কাউকে শত্রুজ্ঞানে আঘাত করবেন না। কারণ সবকিছু তো তাঁরই রূপভেদ মাত্র । তিনি কাউকে শত্রু মনে করবেন না। যদি তাঁর সান্নিধ্যে বা গোচরে এমন কোনো ব্যক্তি থাকে, যার উচ্চারণ-আচরণ  অসঙ্গত  , তাহলে তার শোধনের জন্য যেটুকু আঘাত দরকার, সেটুকুই কেবলমাত্র তিনি করবেন,কিন্তু অন্তরে থাকবে ভালবাসা। 'রক্তকরবী'র রাজা অগণিত মানুষকে শোষণ করে শক্তির অধিকারী হয়েছিল বলে রঞ্জনের নেপথ্য অনুপ্রেরণায় নন্দিনী রাজার প্রতিস্পর্ধী চরিত্র হয়ে রাজ্যে বিপ্লবের ঝড় এনে তোলপাড় ঘটিয়ে দিয়েছে, কিন্তু পরিণতিতে রাজাকেও  তাতে সামিল করেছে । এই দৃষ্টান্ত ভারতের বাইরে থাকলেও তা বিরল। আর উপনিষদের যে ভয়হীনতার বলিষ্ঠ প্রেরণা আছে 'অভী' বাণীর মধ্যে, তারই জয়গান করেছেন রবীন্দ্রনাথ নানা স্থলে । ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা  : 'ভয় হতে তবে অভয় মাঝে নূতন জনম দাও হে।' আবার এক জায়গায়  :
          'এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়, 
          দূর করে দাও তুমি সরব তুচ্ছ ভয়--
          লোকভয়,রাজভয়,মাত্রায় আর।'
                                                          (নৈবেদ্য)
এই সমস্ত ঔপনিষদিক প্রতীতির বাণীরূপ তাঁর 'শান্তিনিকেতন' গ্রন্থে প্রতিটি নিবন্ধেই সুলভ।  
      এবার আসা যাক সারা বিশ্বকে উত্কণ্ঠিত করে তোলা নোভেল করোনা আর তার আনুষঙ্গিক সংকটাবলীর মোকাবিলায় ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতার মূল্যায়নে ।  
     আজ  বিশ্বের সকলকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস, সমন্বয় এবং যুক্তিনিষ্ঠ ও বাস্তব প্রয়োগের উপযোগী কর্মসূচি নিয়ে এগোতে হবে ।কিন্তু কোথায় তা? আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তো দূরের কথা ,আমাদের জাতীয় পটভূমিতেও তার অভাব মাঝে মধ্যেই বড়ো নগ্ন হয়ে ফুটে উঠছে ,যা সমস্যার সমাধানের সামনে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিজের ত্রুটি স্বীকার না করে তাকে ঢাকা দেওয়ার অপচেষ্টা, নিজের জয়গান নিজেই প্রচার করা, প্রতিপক্ষের কোনো ভালো কিছুকে স্বীকৃতি না দিয়ে বরং তার ছিদ্রান্বেষণ এসবের ফলে ঐক্যবোধ, বিশ্বাস, সমন্বয়, বাস্তপোযোগী কর্মসূচি গ্রহণ-- সবই ব্যাহত হচ্ছে । বিশ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে পরস্পরের প্রতি ।অথচ এই মহাসংকটে সেটা অপরিহার্য । তাই 'মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ'(সভ্যতার সংকট) --- এই  রবীন্দ্রভাষ প্রতি মুহূর্তে মননে জাগরূক রাখতে পারার উপযোগিতা এখন বিরাট । আর যতই প্রচার করা হোক ভয় না পাওয়ার প্রেরণা জোগাতে, ভয় তো জাগছেই। এই ভয় নিরসনে তো 'অভী'র মহাভাষ্যকার রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে বড়ো আশ্রয় । তাই আজ রবীন্দ্রনাথের জন্মপক্ষের সূচনালগ্নে আশা রাখছি, ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় শুরু হতে পারে সমাধান প্রয়াসের  নতুন  অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথেরই সমকালীন ও প্রায় সমবয়সী বিবেকানন্দও এই প্রত্যয়ে দৃঢ় ছিলেন যে, অদ্বৈতবাদই পারে বিশ্বমৈত্রীর প্রতিষ্ঠা করতে । আর এটাও বলেছিলেন, 'এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ ' (বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা )। তাই ভারতই আজ পথ দেখানো শুরু করুক না! আর এক পা এগিয়ে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে, যে দেশের জাতীয় সংগীত( National Song) ও জাতীয় স্তোত্র (National Anthem ) বঙ্গসন্তানের রচনা, সে দেশের এই মহাভিযানে মহামতি গোখলের এই বাণীর বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রেও সম্ভব  :  'What Bengal thinks today.......'
         তবে দুঃখের বিষয়,  কী ব্যক্তি কী গোষ্ঠী, বেশির ভাগের মধ্যেই দেখা যায় নিজের কোনো মতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ,সোজা কথায় বিপক্ষকে হারিয়ে জেতার জন্য কোনো বহুজনস্বীকৃত মানুষের সামগ্রিক জীবনদর্শন বা যাপনধারার একটা অংশ নিজের প্রয়োজন মতো তথাকথিত যুক্তির ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে  কেটে নিয়ে সেই রক্তাক্ত খণ্ডটিকে আলোচনার থালায় সবার সামনে পরিবেশন করে শ্লাঘা অনুভব করার প্রবণতা । রবীন্দ্রনাথও সেই নির্মমতা থেকে রেহাই পাননি । রবীন্দ্রবীক্ষণের এই ঔপনিষদিক দিকটিকে কার্যত অস্বীকার করে বা অপব্যাখ্যা করে মানবতাবাদী হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা অনেকেই করে । একজন বড়ো মাপের মানবতাবাদী তো তিনি অবশ্যই ছিলেন,  কিন্তু আজীবন তাঁর মানবতাবোধের জয়গান ছিল ঔপনিষদিক বোধির স্বরগ্রামে বাঁধা । আর এই ঔপনিষদিক অধ্যাত্মবাদকে ভাববাদী ধারণা বলে অনেকেই উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।কিন্তু মনে রাখা উচিত, 'বিজ্ঞান' শব্দটি উপনিষদেই উচ্চারিত হয়েছে প্রথম । আর সেক্ষেত্রে এটি কোনো আচারপ্রধান ধর্মের অঙ্গ নয়, বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার উত্সার। তার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের স্বরূপত কোনো বিরোধ নেই ।আর রবীন্দ্রনাথের ঔপনিষদিক সত্তাও বিজ্ঞানচর্চার বিরোধী তো ছিলেনই না, বরং অত্যুত্সাহী ছিলেন এব্যাপারে, এমনকি বিজ্ঞানবিষয়ক বইও লিখেছেন একাধিক । নিজের পুত্রের একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার ব্যবস্থাও করেছেন, বিশ্বভারতীতে বিজ্ঞান শিক্ষার সুপরিকল্পিত ভিত্তি  স্থাপন করেছেন । তাই তাঁর  ঔপনিষদিক সত্যকে অস্বীকার বা অবহেলা করার অর্থ শুধু রবীন্দ্রনাথের অবমাননাই নয়,  আমাদের এই মহাসংকটের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের জন্য মহামূল্যবান একটি অস্ত্রের শোচনীয় অবহেলা ।  তাই এই রবীন্দ্রপক্ষে বিশ্বের সামনে অদ্বৈতবাদে অভিস্নাত রবীন্দ্রদর্শনকে তুলে ধরার দায়িত্ব নিক ভারতবর্ষ বিশেষত বঙ্গভূমি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বেশিবার পড়া