যে পাখি সৈন্য
প্রদ্যোত আশ
( উৎসর্গ :- যারা লড়ছেন , লড়ে চলেন আমাদের জন্য )১.
- আন্টি ইইইইই
মাস্কের আড়ালে হেসে ওপরের দিকে তাকায় নীলা । ফ্লাটের বেলকনিতে গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ডোডো - আনন্দে বেরকরে ফেলেছে ফোকলা দাঁত । সদ্য তোলা ডালিয়াটা পুজোর সাজি থেকে তুলে দেখায় ডোডোর দিকে । হঠাৎ আতঙ্কিত স্বর ভেসে আসে -ডো , ডোওওওও । মুখ নীচু করে নীলা
- আন্টি কে বাই বলে দাও
প্রায় জোর করেই ডোডোর হাত নাড়িয়ে পেছন দিকে টেনে ঢোকায় বাড়িতে - অবশ্য যাবার সময় ডোডোর মা ও ভদ্রতার হাসি ছুড়ে দেয় । জানা বিষয়েও কেমন অজানা ঠেকে নীলার কাছে । তাড়াতাড়ি আর দুটো ফুল নিয়ে চলে আসে নিজের দরজায় । ঠাকুর ঘরে এসে বসে - গোপালের ভোগ দিতে বেলা হয়ে যাচ্ছে । মেয়েটাকে বললে হতো - বাচ্ছা মেয়ে কত করবে যদিও থার্ড ইয়ার তবু নীলার কাছে সোনাই আর রিকো কারো বয়েসি বাড়ে না । গোটা ঘরটাই তো কোয়ারেন্টাইন অর্ক ফিরেছে জনতা কার্ফুর দু দিন আগে ভুবনেশ্বর থেকে ফ্লাইটে । একা রিকো থেকে গেছে বেণারসে , আসবো আসবো করতে করতেই লক্ ডাউন । কাজের মেয়েকে ছুটি দিতে হয়েছে । অর্কর তো হোম কোয়ারেন্টাইন - তাছাড়া ওর বয়সটাও বাড়ছে - আর পাঁচ বছর চাকরি আছে । নীলা নিজেও হাসপাতাল থেকে ফিরে ঠাকুর রাখার ঘরটাতেই নিজেকে বন্দি রাখছে । না মেয়ে - স্বামী - মা কেউ কাউকেই ছুচ্ছে না । মেয়ে যা পারছে রেঁধে দিচ্ছে সবাই কে ওর এটাই ফাইনাল ইয়ার এত সময় এদিকে দেওয়ার পর রেজাল্ট ধরে রাখতে পারবে তো । অর্কর কাছে মেয়ে কে নিয়ে আতু তুতু করলে রেগে যায় - অর্কর একটাই কথা " তখন তো কোন কিছু পারবো না বললেই বলতে - বাব্বা অর্কদা তুমি এখনো মায়ের ছোট ছেলে " এখন বোঝ নিজের ছেলে মেয়ে গুলো কি বড় হচ্ছে না - ও আমার মেয়ে । চ্যাটিং টা একটু কম করবে । " নীলাকে চেঁচালেও অর্ক মেয়েকে আতু তুতু কম করে না । ঘড়ি প্রায় পৌনে বারোটা - নাইট করার পর শরীর টানছে না । ছুটি হয়ে গেলেও বসে থাকতে হচ্ছে অ্যাবুলেন্সের জন্য - বাড়ির গাড়ি টা গ্যারেজেই পড়ে - নিজে ড্রাইভটা জানলে ভালো হতো । লোকনাথ ব্রহ্মচারির ফটোর সামনে ডালিয়াটা রেখে চুপ করে দাঁড়ায় নীলা - কে জানে কবে সব স্বাভাবিক হবে ! না না এখন আর কাউকেই প্রসাদ দেওয়া চলছে না - ফলত রক্তে চিনি বেশি থাকলেও গোপালের ভোগের থালা থেকে মাখন মিছরি চালান করে নিজের মুখে । একটু পরেই সোনাই দরজায় টোকা দেয় - কাগজের প্লেটে দিয়ে যায় ভুনা খিঁচুড়ি - মুগের সাথে মুসুরিও মিশিয়েছে ইউটীউব বিদ্যা - সঙ্গে ঝুরো ডিম --- এখন মা , বাপি সবার জন্যই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে , প্রোটিন খেতে হবে - সত্যি মেয়েটা বড় হয়ে গেছে । রিকোর জন্য মন কেমন করে ওঠে নীলার - কি জানি ছেলেটা কি খাচ্ছে , রিসার্চের পেপার তৈরি তো খুব সহজ কাজ নয় - ও কি রান্নাটা ঠিক করতে পারছে ? সোনাই এর সামনে এসব মোটেও বলা যাবে না - " হ্যাঁ দাদাই তো দুগ্ধ পোষ্য , নেক্যু পুষু তোমার বেটার বউ না ওকে বাসন মাজা করাবে ।
যাক আজ আর নাইটে যেতে হবে না - চারদিনের ছুটি । তারপর অবশ্য আইসোলেশনে ডিউটি । বাড়ি আসাও বন্ধ , ওখানেই থাকতে হবে । কত দিন যুদ্ধ চলবে কে জানে অন্য দেশের যা সব ছবি আসছে সোশ্যাল মিডিয়ায় ---- । ছুটি পেলেও আবার সেই কোয়ারেন্টাইন । বালিশ থেকেই চোখ খুলে সোজা তাকায় দেওয়ালে লোকনাথের চোখের দিকে । সামনের সুপুরি গাছের মাথায় কি যেন একটা পাখি ডেকে গেল খুব চেনা সুর - সত্যিই এখন কোলকাতা দূষণ হীন - ঝকঝক করছে আকাশ হঠাৎ সকালে বেলার ডোডোর মায়ের মুখটা মনে পড়ে যায় ।
- মা চা
- থ্যাঙ্কু মাম্মা
- ওয়েল কাম ।
ফোনের অ্যালাট টা বেজে ওঠে , অন্তরা কে টাকা পাঠাতে হবে , অন্তরা ওর কাজের মাসির মেয়ে - পড়াশোনাই বেশ ভালো ফলত ওর দায়িত্ব একপ্রকার নিয়েই রেখেছে নীলা । মেয়েটা একবারো ফোন করল না ....... খবরটাও নিলো না নীলার , অন্য সময় তো আন্টি আন্টি করে ঢোক গেলে - নাকি স্বাস্থ্যকর্মীদের ফোনে ও কোরনা ছড়াই । অবশ্য জনতা কার্ফু র সন্ধ্যা বেলা ফাটা থালার ছবি পোষ্ট করেছে অন্তরা । রিকোটা আবার তাতে কমেন্ট করেছে " যারা মিছিল করেছে তারা গোয়ালে থাকুক " অন্তরা অবশ্য রিপ্লাই দিয়েছে " মিছিল করিনি জীবানু ধ্বংসের জন্য শব্দ করেছি মাত্র " সোনাই আবার কমেন্ট করেছে " তুই কি জানিস প্রধানমন্ত্রী কেন ঘন্টা , থালা বাজাতে বলেছিলেন ?" আবার রিপ্লাই " না , আমার দিম্মা বলত শাঁখ বাজালে জীবানু মরে যায় " । নীলা ছেলে মেয়েকে কমেন্ট করা থেকে বিরতকরে । অ্যাপ বেরকরে পে অপসনে লিখে ফেলে ফাইভ জিরো জিরো জিরো , ভাবলো লেখে টাকা তে করোনা নেই - নিজেরই লজ্জা লেগে যায় নিজের কাছে , " মন দিয়ে পড়াশোনাকর " লিখে টাকাটা সেণ্ড করে দেয় ।
২.
ঘর বন্দি থেকে থেকেই ছুটির দিন গুলো পেরিয়ে যায় - একই ঘরে দূরত্ব রাখতে হয় । সবার সাথেই সবার । অর্ক ভাবে , এই সময় বাড়ি না ফিললেই বোধ হয় ভালো হত । ভিডিও কলিং এ সামনে থেকে কথা বলা যেত নীলার সাথে , সোনাই এর সাথেও । নীলার জন্যে গর্ব আতঙ্ক দুটোই কাজ করে । নীলা তখন ট্রেনিং এ - সপ্তাহে একটা চিঠির অপেক্ষাতে থাকতে হতো ওকে । অজানা অশঙ্কা তখন ও হতো --- করোনা নিয়ে দেশ আতঙ্কিত কিন্তু একা করোনাই তো আতঙ্ক নয় - প্রতি নিয়ত জীবানুর সাথে যুদ্ধ করতে হয় - নীলাদের । সোনাই বলছিল ওর বন্ধুর দিদির এই সদ্য বাচ্ছা হয়েছে দেড় মাস কিন্তু পোষ্ট বেসিকে গেছে বলে ম্যাট লিভ পায়নি ওকেও ডিউটি করতে হবে আইসোলেশনে । বাড়িতে অশান্তি হচ্ছে , সবাই বলছে চাকরি ছেড়ে দিতে , দিদির একটাই কথা ডিউটি তো কর্তব্য , ছাড়বো কি করে ? । হ্যাঁ নীলাও কখনো ডিউটিকে চাকরি ভাবেনি । এখন বয়সের ছাপ পড়ছে শরীরে স্বাস্থ্যই রক্তের চাপ চিনি দুটোই বেশি । অর্ক ফিরে যায় তিরিশ বছর আগে ..............
- অর্কদা বসবেন ?
তাপুদার বিয়ে , খেতে গেলে যা হয় - খিদে পেলেও জায়গা তো খুঁজতে হবে । ইতস্ততত করে বসেই পড়ে ও । নীলাকে ও আগেই দেখেছে কিন্তু আজ তো অন্যরকম দেখা , খোঁপায় বেলফুলের মালা । তিনজন সখীর পাশে একজন পুরুষ সংঘাতিক রকমের সংখ্যালঘু । না নীলার আবেশ থেকে বেরোতে পারে না । খুব কাছের মানুষ তাপু দা , একদিন মনের কথা বলেই ফেলে । তাপুদা বলেছিল " নীলা কারো সয় কারো সয় না " সাবধান , তবে তোর ব্যাপার আলাদা । তাপুদার কাছেই পড়ে নীলা , এই তো আগের বছর একটি ছেলে প্রপোজ করে বসল নীলাকে ব্যাস টিউশেন আসা বন্ধ , ক্লাসে স্টেণ্ড করা মেয়েটির জন্য মাসে তিরিশটাকা লস্ মেনে নিতে হল । অর্ক এখনো নীলাকে বলে তাপুদাকে তোমার দুবছরের লস হওয়া সাতশো কুড়ি টাকা দেওয়া উচিত ।
সোনাই চা দিয়ে যায় । আজকেই অর্কর কোয়ারেন্টাইন শেষ হচ্ছে । মেয়েটাকে আর একা খাটতে হবে না । নীলা রেডি হয়ে বেরোচ্ছে আজ থেকে আইসোলেশনে ডিউটি শুরু । অ্যাবুলেন্স আসছে , ফোন করে ছিল । নীলাকে ছুঁতে গেলে সাবানে ধুতে হবে হাত । বুড়ো শিব থেকে বড়কালী যাওয়ার পথটাতে সাইকেল নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম ওর বাঁ হাত রেখেছিল নীলার হ্যাণ্ডেলে রাখা ডান হাতে - পৃথিবী কি এতটা কোমল , না সে দিন আর কিছুতেই ও হাত ছোঁয়াই নি । আজ তবু হাতধুতে হবে । নীলা কি এভাবেই ভাবছে সব । নাকি যুদ্ধ গেলে যুদ্ধটাই সব । ও যখন নিজে সাংখ্য দর্শন পড়ায় , তখন কোন ছাত্র কি বিশ্বাস করবে ও কালীর উপোষ করে ।
৩.
দরজা খুলে বেরিয়ে আসে নীলা । অ্যাবুলেন্সটা এল বলে পারমিতা দি ফোন করেছিল ওর বাড়িতে সবাই কান্না কাটি করছে । পারমিতাদির পর সবিতাদিকে তুলবে তারপর স্বাগতার বাড়ি হয়ে নীলাকে নিতে আসবে । যাক অর্কর কোয়ারেন্টাইনের মেয়াদ শেষ । বাবা মেয়ে খুব খারাপ থাকবে না । রাস্তার ওপরে দুটো শালিক বসে আছে । যাহ এদের তো কোলকাতায় দেখাই যায় না - পশু পাখি সত্যি আজাদ । টিভিতে দেখাচ্ছিল দীঘার সৈকতজুড়ে কচ্ছপের ডিম । হোয়াটস্যাপে অ্যাবুলেন্সের লোকেশন আপডেট দেওয়া আছে - ওই তো জোড়া ব্রীজের কাছে চলেই এসেছে গাড়িটা । অর্ক আর সোনাই দাঁড়িয়ে রয়েছে ।
- আন্টিই ই ই
নীলার চোখ চলে যায় ডোডোদের ব্যালকনিতে । দাদুর কোলে বসে ডোডো ইংরাজী ভি দেখাচ্ছে তারপরেই ফ্লাইং কিস্ । ডোডোর মা ও দাঁড়িয়ে আছে ওর ও অনামিকা আর কনিষ্ঠা বৃদ্ধাঙ্গুলী চাপা , তর্জনি আর মধ্যমার ফাঁক থেকে উড়ে যাচ্ছে রঙিন পাখিরা নীলসাদা আকাশের বুকে সত্যি ই আজ আর দূষণ নেই কোলকাতায় ।
শুনে দেখতে পারেনhttps://youtu.be/x3O4DaEOjXA






