" ঐ তো গো ও যে ঘোরাবে , ফেরাবে আর দেখাবে - ঐ হচ্ছে রামকিঙ্কর " কথা গুলো বলেছিলেন অবন ঠাকুর । রামকিঙ্কর - রামকিঙ্কর বেইজ । বাঁকুড়া - লালমাটির সন্তান । জন্ম ১৯০৬ সালের ২৫ শে মে । মাটির ময়ূর বিক্রি দিয়ে শুরু । কিন্তু বাঁকুড়া তার জন্মক্ষেত্র হলেও সাধন পীঠ হতে পারে নি । কারণ সেখানকার পরিবেশ শিল্প সাধনার উপযুক্ত ছিলনা কিংবা তিনি তাঁর সাধনার সাধনবেদীর স্থান নির্ণয় করতে পারেন নি । যাইহোক ১৯২৫ আগামী যৌবনের প্রাণচ্ছাস - নিজেকে পূর্ণতা দান বা - " আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ " এর মাঝখানে নিজেকে খুঁজে পেতে শিল্পী এলেন শান্তিনিকেতনে । সেখানে শিক্ষালাভ করে পূর্ণ হওয়ার জন্য প্রথাগত ভাবে শিল্পীকেও বসতে হল পরীক্ষায় - তবে একটু আন্য রকম ভাবে আচার্য নন্দলাল বসুর কাছে । জহুরী জহর চেনে কাজেই নন্দলাল বসুর দেরী হল না আগামী দিনের শিল্পীকে চিনে নিতে । ছাড়পত্র মিলে গেল সাধন পীঠে সাধনা করার । রামকিঙ্কর খুঁজে পেলেন চির আকাঙ্খিত সাধন ক্ষেত্র প্রাণের আরাম - মনের আনন্দ - আত্মার শান্তি ।
আপন খেয়ালে আত্মভোলা শিল্পী শান্তিনিকেতনের শান্ত পরিবেশে ইউক্যালিপটাসের ঘন সারিবদ্ধতায় সিমেন্ট বালির তাল ছুঁড়ে গড়ে তুললেন এক লম্বা ছিপছিপে মেয়ের পূর্ণাবয়ব যা আমরা 'সুজাতা' বলে জানি । এই ভাস্কর্য দেখেই কবিগুরু মুগ্ধ হয়ে রামকিঙ্কর কে বলেছিলেন - " ভাস্কর তুমি " । গুরুদেবই প্রথম তার নামের সাথে ভাস্কর বিশেষণটি জুড়েদিলেন । আর দিলেন পারমিশন শান্তিনিকতনের মুক্তাঙ্গন ভাস্কর্য দিয়ে সাজিয়ে তোলার । শিল্পীকে আর দেখে কে " সৃষ্টি সুখের উল্লাসে " নিয়ে গড়তে লাগলেন - সাঁওতাল পরিবার , কলের বাঁশি , ভগবান বুদ্ধ , দীপস্তম্ভ প্রভৃতি বিখ্যাত ভাস্কর্য ।
তারভাস্কর্য গুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রতিটি ভাস্কর্যের এর মধ্যে কর্মময়তার প্রকাশ । সর্বত্রই গতিশীলতার প্রকাশ কোথাও স্থিতিশীলতার লেশমাত্র নেয় । তাছাড়া প্রতিটি ভাস্কর্য , প্রতিটি চিত্র বাস্তবমুখী মাটির সোঁদা গন্ধ তাতে চাইলেই পাওয়া যায় , কান পাতলে শোনা যায় জীবনের স্পন্দন । তিনি স্থবিরতায় বিশ্বাস করতেন না । তাই তাঁর প্রায় প্রতিটি মুভিং সাঁওতাল পরিবার থেকে সুজাতা পর্যন্ত । তাঁর চিত্রকলা তাঁর ভাস্কর্যে বার বার ফিরে এসেছে মাটির কাছের মানুষ । তাঁর সৃষ্টিতে সাঁওতাল শ্রেণীর প্রাচুর্য দেখে কেউ মনে করেছেন তিনি সাঁওতাল । অবশ্য তিনি জাতিতে নাপিত ছিলেন বলেও তাঁকে অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে । ব্যক্তি জীবনে ' নাপিতের ব্যাটা ' বলে জীবনে কাঙ্খিত রমণীর সহচার্য পাননি , এবং এর থেকেই বোধ হয় তিনি সামাজিক রীতি , বিবাহ সম্পর্কে বিতৃষ্ণা বোধ করেন । তাই তাঁর শেষ জীবনের সঙ্গিনী রাধারাণী দেবীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছেন সর্বক্ষেত্রে কিন্তু বিবাহসূত্রে বাঁধেননি । হয়ত ভালোই হয়েছে । চিরকালের মুক্ত বাউল মুক্ত - ই রয়ে গেলেন ।
গ্রন্থ ঋণ :- রূপতাপস রামকিঙ্কর - ডঃ নমিতা মণ্ডল ,
ঋণ :- আন্তর্জাল
ব্যবহৃত চিত্র : - তাপস অধিকারী

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন