।।১ ।।
সারাদিনের ক্লান্তির পর কাশ্যপ পুত্র রক্তিম ঘুমতে চলেছে । নব বধূর লাজ রাঙা আকাশ ঋতুর মনে জীবনের স্বপ্ন নিয়ে আসে । ও ভাবে এই আকাশের হুবহু যদি ধরা যেত তুলি ক্যানভাসে ! আজ অনেক দিন পর ঋতুর মনে আনন্দ উঁকি দিল । রানুর ব্যপারটা উড়ে আসা লোকে খাওয়া বিড়ির ধোঁয়ারমত গুরুলে রেখেছিল ওর অস্তিত্ব কে । না কোন ঝগড়া , বিবাদ , কথাকাটাকাটি কিছুই হয়নি । তবু কিছুদিন যাবৎ ঋতু বুঝতে পারে ওর সাথে রানুর বন্ধুত্বের যোগটা আর পাঁচটা বন্ধুর থেকে বেশিকিছু নয় । ও যে আশ্রয়ের আশায় বারবার ছুটে গেছে বট গাছ ভেবে সেটা আসলে বনসায় করা ।
মোবাইলের টা বেজে উঠল ইমন আলাপে , সন্ধ্যা ছটা । দেবলীনাদির কাছে যেতে হবে , শান্তিনিকেতন সম্পর্কে ইনফরমেশন নিতে । ঋতু ওর ছোট জীবনের মধ্যে এটুকু বুঝেগেছে শিল্পী ঋতব্রত হিসেবে ফোকাসে আসতে গেলে ওর ঠিকানা শান্তিনিকেতন । এই মফঃস্বলে বোদ্ধা আঙুলে গোনা যায় । ছবি ও যতই ভালো আঁকুক উচ্চ মাধ্যমিকে আশি শতাংশ ছুঁতে না পারাটাকে এক দাদা ছাড়া মেনে নিতে পারেনি প্রায় কেউ ই । আর ভরসা জোগানোর লোক চল্লিশ জন মাষ্টারের মধ্যে একা সুমিত কাকু । রানু তো ভালোকরে কথায় বলেনি , শুধু বলেছিল " মন খারাপ করে কি হবে , চেষ্টা কর পরে ভালো হবে নিশ্চয় "।
দেবলীনার সাথে ওর আগে থেকে আলাপ তেমন নেই , শুধু জানে ওর দাদার ক্লাসমেট । দেবলীনা ওখানে বাংলা অনার্সের ছাত্রী , ছবিও ভালো আঁকে সোশাল মিডিয়ায় বুড়ো আঙুল দেখায় অনেকেই ওর দাদার ওয়ালে দেখেছে । সে যাই হোক ওখানের ফাইন আর্ট সম্পর্কে যদি কিছু ইনফরমেশন পাওয়া যায় তো ভালোই । দরজায় সাইকেলটা স্টেন্ড করে কলিং বেলটা অন করার পর দরজা খোলেন এক মাঝ বয়েসি ভদ্রমহিলা , তাকে দেখে ঝি চাকর যেমন মনে হয় না তেমনি মনে হয় না এ বাড়ির সদস্য । ঋতু জানায় ও দেখা করতে চায় দেবলীনার সাথে । মেয়েটি ওকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে গিয়ে বসায় । বসে থাকতে বেশ আড়ষ্ট লাগছিল । ওকে ঠিক লাজুক বলা যায় না , তবে নিতান্তই মুখ চেনা কোন মেয়ের বাড়িতে ইনফরমেশন নিতে আসা ! সোফার এককোনে বসে থাকতে থাকতে ওর চোখ চলে যায় সামনে দরজার উপর সাজানো রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি গুলোর দিকে তার পাশে যামিনী রায়ের পট, এমন সময় রেম্প বেয়ে এগিয়ে আসে দেবলীনা - মুখটাকে বলায় যায় শরৎ শিউলি ভোর ।
- কেমন আছিস ?
- ভালো
- দাদা কি করছে ?
- পড়ছে
- সব সময় পড়ে নারে !
ঋতু মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ে , ওর স্নায়ু তন্ত্রে রক্তচলাল হতে থাকে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে । দেবলীনা ওকে বর্ধমান থেকে শান্তিনিকেতন যাবার টাইম টেবল দিয়ে ফোন করল লাবনীকে , ওর দাদা ওখানে এম . এফ .এ করছে । ঋতু এক মনে চেয়ে থাকে টেলিফোনে কথা বলতে থাকা দেবলীনার দিকে । এমন অপরূপ লাবন্য ও এর আগে দেখেনি , যদি ও এ বয়সে বড়রাই বেশি চোখ টানে কিন্তু এ টান সে টান নয় - ও যেন পাহাড়ি নদীর স্রোতে ভেসে যায় । দেওয়ালে টাঙানো যামিনী রায়ের মা এর কোলে শিশু আর মেরির কোলে যিশু - ছবি গুলো একাকার হয়ে মিশে যায় দেবলীনার মুখে । লাবনী জানতে চায় ও কার জন্য ইনফরমেশন চাইছে , দেবলীনা বলে ওর একটা ভাইয়ের জন্য - এই ভাই ডাক টা পূর্ণিমার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে ঋতুর বুকে । নারী কন্ঠের এই ডাক টা শোনার জন্য ও জ্ঞানাবধি ছটফট করছে । ঋতুর মন জড়িয়ে ধরে দেবলীনাকে এক ঝাপটায় ।
বেশ কয়েক দিন হয়ে গেল দেবলীনাকে ফোন করা হয়নি । সে দিনের পর থেকে এক অজানা আকর্ষণে বারবার ও ছুটে যায় দেবলীনার কাছে । ঋতুর মনে হয় শিল্পী হতে গেলে একটা পাওয়ার অফ সোর্স লাগে আবার এও মনে হয় নিছক কোন প্রেমের সম্পর্কে এটা পাওয়া যায় না । রানুর মধ্যে ও এই সোর্সটাই পেতে চেয়েছিল ....................... ভাবে চকচক করলেই সোনা হয় না । মনে আছে সুমিত কাকু বলেছিল ক্যাকটাসের মতো বাঁচার কথা । রেজাল্ট আউটের পর রাত্রে মরুভূমির বুকে একা দাঁড়িয়ে থাকা একটা ক্যাকটাসের স্কেচ আঁকতেও শুরু করেছে । তবে সেদিন দেবলীনা দের বাড়ি থেকে ফেরার পর আঁকাটা শেষ করার ইচ্ছে লুকিয়ে যায় ।
।। ২ ।।
বীরভূমের গরমটা খুব বেশি কষ্ট না দিলেও ঘুম আসেনা দুপুরে । পরশু পরীক্ষা কয়েক দিনই আছে ও এখানে , দেবলীনা লাবনীর দাদাকে বলে কোচিং এর ব্যবস্থা করে দিয়েছে । আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে বসে পড়ে বিছানায় , ডরমেটরী হলে বিছানায় একমাত্র নিজস্ব জায়গা বসা , আঁকা , ঘুমনো পর্যন্ত । সাদা কাগজে ফুটে উঠতে থাকে স্বপ্নের রেখা - বুক অবধি চাদর মুড়ি দেওয়া কিশোর - মাথা রাখা আছে আবছায়া নারী মূর্তির কোলে - মেয়েটির হাতের আঙুল মাথার চুলে জড়ানো , ছবিটা শেষ হলে নারী মূর্তির সাথে মিশে যায় দেবলীনার মুখের আদল । আকাশটা ঘন হয়ে এলে ঋতু বেরিয়ে পড়ে বৃষ্টি দেখতে । স্কুলে গল্প শুনেছে কোন একদিন রবীন্দ্রনাথ আকাশে মেঘ দেখে বোলপুর ষ্টেশন থেকে ফিরে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে । উত্তরায়ণ কে বাঁদিকে রেখে ও ঢুকে পড়ে ছাতিম তলার দিকে - বৃষ্টিটা বেশ ভালোই এসে গেল , বেশ জোরে । ঋতু আশ্রয় নিল গোল ছাউনির বেঞ্চে । শাল বিথী , আম্রকুঞ্জ সব জায়গাতেই আলো করে আছে কপোত কপোতিরা । ও এক ভাবে তাকিয়ে থাকে ছাতিম তলার দিকে এখুনি হয়ত উদয় হবে গোলাপি সাইকেল আর তার উপরে কালো টপ রাজস্থানী প্রিন্ট লংস্কাট পরা হাসি মুখ । দেবলীনা প্রতিদিন ই একবার ছাতিম তলায় আসে .......... । জলের ঝাঁটে ঝাপসা হয়ে আসছে চশমার কাঁচ , চশমা টা খুলতে বরং দেখা যাচ্ছে ভালো । বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছে পথের ধুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে পায়ের ছাপ রবীন্দ্রনাথ , রামকিংকর , নন্দলাল সব - কিংকরের হাত ধরে ঋতু এসে দাঁড়ায় অণির্বান দীপের সামনে ঋতু মূর্তিটাকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করতে করতে চিনতে পারে নারীমূর্তি টাকে । মোবাইল টা বেজে উঠলে ঋতুর চারদিক ফাঁকা হয়ে যায় - অনির্বান দীপের সামনে ও দাঁড়িয়ে আছে চুবড়ি ভিজে হয়ে ।
ভেজার অভ্যাস না থাকলে যা হয় , ভোর থেকে ধুম জ্বর । পেরাসিটামল খেয়ে ও ঘুমিয়ে পড়ে , চুলের ভেতরে আঙুলের ছোঁয়াতে চোখ খোলে
- এত বৃষ্টিতে কেউ বেরোয় ?
- ভিজতেই তো বেরিয়ে ছিলাম
- বাঁদর ছেলে কাল পরীক্ষা
- দেব দিদি তুমি থাকলে জ্বর পালাবে
- আমি যদি রানু হয় ?
- মানে ?
দেবলীনা ঋতুর ডাইরিটা নাচাতে থাকে । বছর পাঁচের ছেলের মতো দেবলীনার গলাটা জড়িয়ে ধরে ঋতু , দু চোখ দিয়ে নেমে আসে আনন্দের অশ্রুজল ।
- ক্যাকটাস আঁকবি না ?
জবাবে ঋতু শুধু মাথা নেড়ে গেল ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন